অটোয়া, মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯
গল্পটা আমাদের -সোমের কৌমুদী

দাদুর কণ্ঠে বুড়ি, বুড়ি ডাক শুনেই দৌড়ে রান্নাঘরে গেল মৌরী। মাকে জড়িয়ে ধরল।মা একটুও অবাক হলেন না। মৌরীর এটা নিয়মিত কাজ। এত লক্ষ্মী একটা মেয়ে কিন্তু দাদুর প্রসঙ্গ এলেই কেমন যেন হয়ে যায় সে। এটা ঘৃণা না ভয়, এতদিনেও বুঝতে পারেন না তিনি।শান্ত আর স্বাভাবিক ভাবেই বলতে শুরু করলেন তিনি।
--- দেখ মা, তুমি এখন বড় হচ্ছ। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়। তোমার এরকম করা মানায় না।  
কিছু বলে না মৌরী। চুপচাপ থাকে। মা আবার বলতে শুরু করেন---
--- তোমার দাদু তোমাকে কত ভালবাসেন! তাঁর সঙ্গে একটু খেললে, একটু কথা বললে, একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখলে তোমার কি হয়! 
কথাগুলো বলেই মৌরীর মুখের দিকে তাকান তিনি। মাথা নিচু করে একটা অপরাধী মুখ নিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে মৌরী। মাথা নিচু করেই মায়ের কথার উত্তর দিতে শুরু করে।
--- আমার কেন যেন কেমন কেমন লাগে!
--- কেন এমন লাগে?
--- একটু ভয় ভয় করে আমার,আম্মু।
--- উনি তোমার দাদু। এখানে ভয়ের কি আছে, মা?
মৌরী কিছু বলে না। মাথা নিচু করে নিচের দিকেই তাকিয়ে থাকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন মা।

সেদিন বিদ্যালয় ছুটি হতেই লুবাবাকে নিয়ে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয় মৌরী। লুবাবা তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। ওদের বাসার পাশের বাসাটিই লুবাবাদের। দুজনে হাত ধরে এগিয়ে চলে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দিকে। প্রতিদিন লুবাবার দাদু ওদেরকে বিদ্যালয় থেকে বাসায় নিয়ে যান। অন্যান্য দিনের মত আজও দাদু বিদ্যালয় ছুটির আগেই এসে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ওদেরকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে আসেন।
--- এই যে আমার দুই পরী, বিদ্যালয়ে আজ কেমন কাটল আপনাদের ?
--- খুব ভালো। সমস্বরে উত্তর দেয় দুজনে।
তোর ভালো কাটলেও তোর চেয়ে আমার আরো ভালো কেটেছে। টিপ্পনী কাটে লুবাবা। দাদু কিছু বুঝতে পারেন না। একটু বড় চোখে তাকান ওদের দিকে। এবার মুখ খোলে মৌরী।
--- দেখ তো দাদু, বাড়ির কাজে শুধু দুইটা বানান ভুল করেছি। তাই বলে কি আমার ভালো কাটে নি?
এবার বুঝতে পেরে হেসে ফেলেন দাদু। দুজনের স্কুল ব্যাগ দুই কাঁধে নিয়ে হাঁটতে শুরু করেন। যেতে যেতে কথা বলেন ওদের সাথে।
--- হুম। অবশ্যই ভালো কেটেছে।তবে আবার যাতে বানান ভুল না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে।
--- জী দাদু, রাখব। উত্তর দেয় মৌরী।
দাদুর সাথে কথা বলতে বলতে বাসার দিকে এগিয়ে চলে মৌরী আর লুবাবা। দাদুর কথা শুনে ওরা অনেক মজা পায়, অনেক কিছু জানতেও পারে। বাসার সামনে এলে মৌরীকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে নিজেদের বাসার দিকে এগিয়ে যায় লুবাবা আর দাদু।   

আজ  শুক্রবার। বিদ্যালয় বন্ধ।মৌরীর মনে অনেক আনন্দ। শুধুমাত্র বিদ্যালয় বন্ধ থাকার জন্য নয়, আব্বু-আম্মুর সাথে আজ সে মেলায় যাবে। ওদের বাসার কিছুটা দূরে যে ছোট্ট খেলার মাঠ আছে, সেখানে প্রতিবছর মার্চ মাসে মেলা বসে। এর আগে সে কখনো এই মেলায় যায় নি, আজ যাবে। এই মেলার কথা সে অনেক শুনেছে, মেলায় কী কী পাওয়া যায় তাও সে শুনে নিয়েছে লুবাবা’র দাদুর কাছে। নাগরদোলার কথা শুনে মৌরীর এতই আগ্রহ জন্মেছে যে মেলার আজ প্রথম দিনেই সে জিদ ধরেছে মেলায় যাবার। ঘরে বসে মৌরী নাগরদোলায় চড়া ছাড়াও আর কী কী কিনবে তার তালিকা করছে। এমন সময় সেখানে এলেন মা।
--- মৌরী, আমরা একটু পরেই মেলায় যাব।দাদুকে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে নাও। 
কথাগুলো বলেই ঘরের এলোমেলো কাপড়গুলো গোছাতে শুরু করেন।
--- দাদুকে নিয়ে যাব! লাফ দিয়ে উঠে মৌরী।
--- হুম। স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দেন মা।
--- না। দাদুকে নিয়ে যাব না।
--- কেন? লুবাবাও তো ওর দাদুকে নিয়েই যাবে।
--- যাক। লুবাবা’র দাদু কত্ত ভালো। আমাদের বিদ্যালয় থেকে নিয়ে আসেন, গল্প শোনান। আর আমার দাদু পঁচা। হাঁটতে পারেন না, শুধু হুইল চেয়ারে বসে থাকেন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন মা। মৌরীর আরো কাছে এগিয়ে যান।মাথায় হাত রাখেন ওর। 
--- আচ্ছা মৌরী, আমাদের দেশের নাম কি? 
--- কেন! বাংলাদেশ।
--- তুমি কি তোমার দেশকে ভালোবাসো?
--- হুম, অবশ্যই ভালোবাসি।
এবার একটু অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকায় মৌরী। মা আবারো বলতে শুরু করেন।
--- আচ্ছা, তুমি কি জানো কিভাবে আমরা আমাদের বাংলাদেশকে পেয়েছি?
--- জানি তো। একদিন শ্রেণিতে আমাদের বৃষ্টি ম্যাডাম সেই গল্প বলেছেন।
--- কি বলেছেন বৃষ্টি ম্যাডাম?
--- আমাদের এই দেশটা নাকি আগে বাংলাদেশ ছিল না। যুদ্ধ করে আমরা আমাদের দেশ পেয়েছি। সেই যুদ্ধে অনেক অনেক লোক মারা গেছেন। অনেক মানুষ নাকি পঙ্গু হয়েছেন।
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলেই থামে মৌরী। উত্তর জানার আনন্দটা তার চোখেমুখে ঝিলিক দিয়ে উথে। মা আবারো বলতে শুরু করেন।
--- হুম। বৃষ্টি ম্যাডাম ঠিকই বলেছেন।
--- হুম।
--- তুমি তো জানো তোমার দাদু সেই যুদ্ধে পা হারিয়েছেন। তোমার দাদু ও অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই আমরা আমাদের দেশ বাংলাদেশকে পেয়েছি। যাঁদের জন্য দেশকে পেয়েছি ,তাঁদের সাথে এমন করে না মা।
--- হোক। তবুও দাদুকে নিয়ে যাব না।
মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। মৌরীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। ভেবেও তিনি কারণ খুঁজে পান না কেন সব বিষয়ে এতো লক্ষ্মী একটা মেয়ে শুধুমাত্র এই একটা বিষয়ে এমন করে। 

দাদুকে ছাড়াই মায়ের সাথে মেলায় যায় মৌরী। দাদুকেও আনতে চেয়েছিলেন মা। দাদু একটু অসুস্থ্যবোধ করাতে তিনি আর আসেন নি। মৌরীর বাবাকে তাই বাসায় রেখে এসেছেন। মৌরীরা যখন মেলার প্রধান ফটকের কাছে আসে তখন সেখানে এক জটলা   মানুষ। মা পাশের এক ভদ্রমহিলাকে প্রশ্ন করে জানলেন উদ্বোধনের জন্য প্রধান অতিথির আসতে দেরি হওয়াতে মেলার গেট এখনও খুলে দেয়া হয়নি। সবাই যখন অপেক্ষা করছে তখন মাইকে ঘোষণা এলো—“আপনারা সবাই একটু সরে জায়গা করে দেন আমাদের প্রধান অতিথির জন্য। তিনি আমাদের মাঝে এসে পৌঁছেছেন। এখন তিনি ফিতা কেটে এই মেলার উদ্বোধন করবেন।” ঘোষণা শুনে মৌরী উৎসুক হয়ে পিছনে তাকায়। হুইল চেয়ারে একজন বসে আছেন, ঠিক যেন দাদুর মত। একজন যুবক সামনে থেকে ভিড় সরিয়ে জায়গা করে দিচ্ছে আর একজন  হুইল চেয়ার ঠেলে সেই বৃদ্ধকে নিয়ে আসছে। কিছুটা অবাক হয় মৌরী। মায়ের মুখের দিকে তাকায়।
--- মা, উনি কে?
--- উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা মা। আজকের মেলার তিনিই উদ্বোধন ঘোষণা করবেন।
--- ইনি কেন? আর কি কেউ নেই!
আরো কিছুটা অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মৌরী।
--- মুক্তিযোদ্ধারা আমাদেরকে এই দেশ উপহার দিয়েছেন। তাঁরা এদেশের প্রকৃত সন্তান। অন্য অনেকের চেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তি। তাই তিনিই আজ মেলার উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। 
মায়ের কথা শুনে আজ হঠাৎ মৌরীর মুখচ্ছবিতে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। ভাললাগা মিশ্রিত আনমনা একটা সুখ দোল দিয়ে যায় মৌরীর মুখে। মা কিছুটা অবাক হয়ে যান।
--- কি হলো মৌরী! তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? 
মৌরী কিছু বলে না। মায়ের হাত ধরে ঘুড়ে দাঁড়ায়।
--- মা, চলো। এক্ষুনি চলো! 
এবার আরো বেশি অবাক হন মা। কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না তিনি। কিছুটা ঘাবড়ে যান।
--- কোথায় যাব?
--- দাদুকে আনতে। দাদুও তো একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনিও তো একজন সম্মানীয় ব্যক্তি। বাসায় চলো। দাদুকে নিয়েই আবার মেলায় আসব।
মৌরীর মুখে এমন কথা শুনে এক অপার্থিব সুখ দোল দিয়ে যায় মায়ের মনে। অকৃত্রিম সুখের অশ্রু সিক্ত করতে চাচ্ছে তার দুচোখ। মৌরীকে কোলে তুলে নেন তিনি। কপালে এঁকে দেন ভালোবাসার চুমু। ছোট্ট শিশুর মত দুহাতে মৌরীকে মাথার উপর তুলে ধরেন। যেন তার হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা। বাতাসের সাথে যেন পতাকাটা পতপত করে উড়ছে।

সোমের কৌমুদী । বাংলাদেশ