অটোয়া, মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯
সর্বশেষ আবিষ্কৃত স্বর্গখণ্ড - হিমেল জহির

শিয়ার দক্ষিণ পূর্ব কোণে অবস্থিত অসাধারণ সুন্দর এক দেশ ইন্দোনেশিয়া। ৫০০০ দ্বীপের সমন্বয়ে এ দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ বালি। বালি যাবার স্বপ্ন আমার বহুদিনের। বিশেষত এর নীল জলরাশির কথা শুনে আসছি বহুদিন আগে থেকেই। তাছাড়া বালি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে ডেনপাসার যেতে সমুদ্র পাড় দিয়ে যে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হয়েছে গুগল ম্যাপে তা দেখে দেখে উক্ত স্বপ্ন রূপ পেয়েছে চঞ্চলতায়। বাংলাদেশ থেকে ফ্রি ভিসাতে যাওয়ার মতো দ্বীপরাষ্ট্রের মধ্যে মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়াই বোধ করি সবচেয়ে সুন্দর। ঢাকা থেকে সরাসরি কোনো ফ্লাইট না থাকলেও মালেশিয়া বা থাইল্যান্ড এর কানেকটিং ফ্লাইটে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় বালিতে। আমার যাত্রা আরো একটু ভিন্নতর করে সাজানো ছিল। একটি দেশের রাজধানী তার প্রতিনিধিত্ব করে। তাই আমার ভ্রমণ রুট ছিল ঢাকা-ব্যাংকক-জাকার্তা-বালি। জাকার্তাতে যাওয়া এবং আসার পথে দুই রাতের অবস্থান ছিল আমার। জাকার্তা থেকে বালির দূরত্ব প্রায় ১২০০ কি.মি.। কেবল দূরত্ব নয় সময় ও সাংস্কৃতিকভাবে জাকার্তা ও বালির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। দুটো জায়গা ভ্রমণ না করলে একই দেশের মধ্যে এ বৈচিত্র্য কখনই চোখে পড়বে না। জাকার্তা ও বালির সময়ের মধ্যে যেমন রয়েছে ১ ঘন্টার ব্যবধান, তেমনি তাপমাত্রাও বালিতে অনেক কম। এয়ারপোর্টে নামার সাথেই একথার জানান দেয় যে বালি এক অনন্য স্থান। শীতল আবহাওয়া, পরিষ্কার আকাশ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ মনকে অন্য ভুবনে নিয়ে যাবে। ফ্লাইট থেকে নামতেই চোখে পড়বে ‘দ্য লাস্ট প্যারাডাইজ ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’। এয়ারপোর্টের চারপাশের পরিবেশও উপভোগ্য। এখান মানুষগুলো খুব অতিথিপরায়ন। কোনো কিছুর দাম অতিরিক্ত নেয় না। অল্পতেই যেন এরা খুশি। তবু দরদাম করা যাদের অভ্যেস তারা একটু কমাতে ভালোবাসি। মটর সাইকেলে চড়া এখানে ভয়ের বিষয় নয়। ট্রাফিক সিগন্যাল এত সুন্দর মানা হয় যে, রাস্তায় খুব বেশি জ্যামও থাকে না। এখানে আরো একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো, কোথাও কাউকে এক্সট্রা কোনো বকশিশ চাইতে দেখা যায়নি। আমার উদ্দেশ্য ছিল তিনটি স্থান ঘুরে দেখা। ১। Gili ও Lombok দ্বীপ বোটে ভ্রমণ, ২। Beratan Temple ৩। tanah lot এর সৌন্দর্য উপভোগ করা। এই স্থানসমূহ পরিদর্শনে যে সব রাস্তা ব্যবহার করতে হয়েছে তা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও গ্রামীণ মমতায় ভরপুর। প্রকৃতিকে ঠিক রেখে আধুনিকতার সকল ছোঁয়াই রয়েছে এসব জায়গাতে। বিশেষ করে  tanah lot এ সময় কাটানোর জন্য বেশ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে চারপাশের পরিবেশ। মনে হবে সমুদ্র সৈকত নয় যেন এক স্বর্গীয় উদ্যানে বসে আছি।  Beratan Temple এমন আরেকটি উদ্যান। সারাদিন কাটালেও আপনার কখনই এখানে বিরক্তি আসবে না। কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না। কোনো বাদামওয়ালা বা চাওয়ালাও না।



এসব রাস্তা গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে গেলেও কোথাও ভাঙাচোরা বা ধুলাবালিযুক্ত রাস্তা আপনি খুঁজে পাবেন না। তবে আমি যে সৈকতের পাড়ে হোটেল নিয়েছিলাম এ সম্পর্কে একটু না বললেই নয়। আমাদের কক্সবাজারের মতো এতো বড়ো সমুদ্র সৈকত বিশ্বের আর কোথাও হয়ত মিলবে না তবে এখানকার সৈকতে প্রচুর গাছপালা ও বিভিন্ন মনোরম কটেজ রয়েছে। কিছু শপিং মলও গড়ে উঠেছে সৈকত ঘিরে। উক্ত শপিং মলের সামনের খোলা প্রান্তরে প্রতি সন্ধ্যায় থাকে নানা উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন। এখানকার সন্ধ্যেগুলো এভাবেই হয়ে ওঠে উপভোগ্য। নাম তার কোতা বীচ। বীচের পার ধরে সরাসরি এয়ারপোর্ট থেকে হেঁটে যেতে ১ ঘণ্টার মতো লাগে। বীচে বসে বিকেলে উপভোগ করা যায় এয়ারপোর্টে বিমান অবতরণের দৃশ্য, সেই সাথে সূর্যাস্ত। কোনো মধ্য দুপুরে উত্তাল ঢেউ জানান দিয়ে যায় সমুদ্রের শক্তিময় সৌন্দর্য। বিকেলে তারই শান্ত রূপ। দিনে খানিক গরম লাগলেও রাতে নামে ঠাণ্ডা। শীত গ্রীষ্ম বলে এখানে কিছু নেই। সবসময় বসন্ত বিরাজ করে এখানে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। তাতে শস্য উৎপাদনে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করে না। বাসন্তী বিবিধ ফুল ফুটে থাকে প্রায় বাড়িতে। মনে হয় প্রতি বাড়িতেই একটি করে ফুলের গাছ আছে আকারে একটু বড়ো নাম Plumeria (Frangipani) এটি বালির কমন ফুল। এবারে গিলি সম্পর্কেও একটু না বললে নয়। গিলিতে যাওয়ার পথে দুটো ব্লু লেগুন বীচ এর সাক্ষাৎ মিলবে। গিলিতে আছে তিনটি দ্বীপ ও এর চারপাশের পানি এতই নীল যে মনে হবে কেউ এতে নীল মিশিয়ে রেখেছে। তীরের পানিগুলো পেস্ট কালার এবং স্বচ্ছ। তীরের বালুগুলো সাদা চুনা পাথরের বলে পানিতে স্বচ্ছতা বিরাজমান। গিলি ও লম্বক আপনাকে এভাবে আকৃষ্ট করবে। সব মিলিয়ে বালিতে আপনার মন পড়ে থাকবে বারবার ফিরে আসার জন্য। সময় স্বল্পতায় আমি যে জায়গাটি স্পর্শ করতে পারিনি তা হলো নুসা পেনিদা। আগামী ভ্রমণে আশা করছি এখানে কাটবে কিছু সময়। 

হিমেল জহির । ঢাকা