অটোয়া, রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
কাব্যগ্রন্থ "এখানে অবারিত মাঠে" গ্রাম বাংলার চিরায়িত রূপ ফুটে ওঠেছে - রতন কুমার তুরী

গ্রাম বাংলার মাটির সন্তান ইউনুছ ইবনে জয়নাল। কাব্য চর্চা করে চলেছেন সেই ছোট কাল থেকেই।  পিতা মুক্তিযোদ্ধা   মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধে ১১ নং সেক্টরের একজন গর্বিত সৈনিক ছিলেন।  পিতার দেশ প্রেমের রক্ত ইউনুছ ইবনে জয়নাল-ধমনিতে প্রবাহিত তাই লেখক সর্বদাই লিখে চলেছেন দেশপ্রেম মূলক কবিতা, ছড়া, গল্প, কাহিনী। বগুড়ার দৃষ্টি নন্দন গ্রাম ধলিয়াকান্দিতে জন্ম গ্রহন করা ইউনুছ ইবনে জয়নাল ইতিমধ্যে লেখনিতে তার মেধার পরিচয় দিয়েছেন। লেখকের বিভিন্ন লেখা ইতিমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকা এবং ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে এবং তা বেশ পাঠক প্রিয়তাও পেয়েছে। 

ইউনুছ ইবনে জয়নাল মূলতঃ লেখা লেখি করেন গ্রাম, গ্রামের চিরকালীন সৌন্দর্য এবং গ্রামিণ মানুষকে নিয়ে। লেখক সময় পেলেই ছুটে বেড়ান তার গ্রামের মেঠো পথে, সেখান থেকে রসদ নিয়েই রচনা করেন বিভিন্ন কাব্য। আমার আলোচ্য লেখকের কাব্য গ্রন্থ ' এখানে অবারিত মাঠে ' ও এর ব্যাতিক্রম নয়। একাব্য গ্রন্থটিও লেখক রচনা করেছেন বাংলার চিরকালিন সৌন্দর্যের বিস্তারিত বর্ণনা, উপমা এবং মেঠো পথের মানুষদের জীবন কাহিনী দিয়ে। লেখক বইটির শুরুতেই শহর থেকে সকলকে গ্রামে ফিরে যাওয়ার আহবান জানিয়ে অসম্ভব সুন্দর এক গ্রামিণ কবিতা দিয়ে শুরু করেছেন - কবিতাটির কিয়দংশ পাঠকদের জন্য নিচে দেয়া হল-

গ্রামে ফিরে যাও 
অপরূপ মহিমায় আল্পনা এঁকে 
এক একটি গ্রাম দাঁড়িয়ে আছে বাংলার বুকে।
পাখায় ভর করে মানুষ আজ উড়ে বেড়াচ্ছে
বস্তুগত ভালোবাসার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজে মরছে। 
জীবনের অকৃত্রিম বাসর ঘর ভেঙে রোজ বিহানে 
সবাই শহরমূখী হচ্ছে অজানা সুখের সন্ধানে। 
কাঁশবনে সোণামণিদের চলে মিছিল 
নদীর জলে ভাসে প্রাচিন গ্রামের ফসিল। 
-------------------

৩২ লাইনের এই কবিতাটির প্রতিটি লাইনে কবি তার মনের মাধুরি মিশিয়ে ছোট ছোট উপমার ব্যবহার করেছেন। পুরো কবিতাটিতে কবি ইউনুছ ইবনে জয়নালের গ্রামের প্রতি গভির মমত্ববোধ ফুটে ওঠেছে। কবিতাটি কবি ইউনুছ ইবনে জয়নাল শহরের শিক্ষিত মানুষদের গ্রামে ফিরে এসে গ্রামকে রক্ষা করার যে সাহসি উচ্চারণ করেছেন তা সত্যিই বিরল।   কবি যেনো তার অন্তর আত্মাকে প্রকৃতির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন । কবির " এখানে অবারিত মাঠে " কাব্য গ্রন্থের আরেকটি কবিতা-

সবুজ শ্যামল গাঁয়ে
নদীর পাড়ের মাঠ ঘেঁষে রয়েছে
আমার সবুজ শ্যামল গাঁ, 
তার উঠানে চলতে গেলে 
লাগে দূর্বা ঘাসের ঘা। 
কলমি লতা ক্ষেতের পাশে 
পদ্ম ঝিলের জলে, 
পল্লীবালা গামছা বেঁধে
শাক কুড়াতে চলে। 
---------------

অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় রচিত কবির এসব কবিতা সহজেই পল্লী বাংলার মানুষকে কাছে টানে আর তাই কবি হয়ে ওঠেন গ্রামের মানুষের কবি। কবি ইউনুছ ইবনে জয়নাল যথেষ্ট সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কখনও গ্রামকে ছেড়ে যাওয়ার কল্পনাও করেনি। নিজের সকল সহায় সম্পত্তি নিয়ে এবং নিজ সন্তান সন্ততিদের নিয়ে তিনি গ্রামেই বসবাস করে চলেছেন। আর একের পর এক লিখে চলেছেন গ্রাম বাংলার কবিতা। কবি ইউনুছ ইবনে জয়নাল তার " এখানে অবারিত মাঠে " গ্রন্থটিতে তার শিশুকাল, কৈশোরকাল এবং যৌবন কালের অনেক কথাই কবিতার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন যা তার লেখনিকে আরো শানিত করেছে। যেমন কবির' আপন আবাসের টানে ' কবিতায় ফুটে ওঠেছে আপন নীড়ে ফেরার আকুলতা ---

গাঙচিল উড়ে গেছেঃ-শুন্য নদী তীরঃ- বুক,
আজ নয়ঃ- কাল নয়; সে কবেকার কথা,
তারপর আবার হঠাৎ একদিন এসেছে ফিরে ; মনে শোক ;
বুঝেছে সে অনুভবে; আবাস ছেড়ে যাবার ব্যথা।
নদীর জলে খুঁজেছে সে হারানো হৃদ্যতা ; ক্লান্তি সয়ে 
পেয়েছে সে; সেই কি মহানুভবতা ;-কৃতজ্ঞতা বিধাতারে,
তার পদচারণায় স্নিগ্ধ জলে পূর্ণ দু'কুল বয়ে 
ছুটে চলেছে নদী সাগর নিজেকে উজার করে। 
------------------------

সেই জল সেই নদী ;-নদীর বেলা ভূমি    
জলের গন্ধ মাখা ফসল ; কূলে সাথীদের আসর,
কোথাও পাইনি সে তার প্রবাসী জীবনে ;
কেবলই নিরাশা - হতাশা আর যন্ত্রণাময় বিদেশি বাসর।

এধরণের অনেক কবিতাই বইটিতে স্থান পেয়েছে, যেমন - ১/ বাংলার রূপসী প্রকৃতি ২/বিলের দেশে ৩/বাংলার মাটি ৪/ আমার গ্রাম ৫/মায়ের দেশে ৬/ এখানে অবারিত মাঠে ৭/সোনালী ভোর ৮/পল্লীর মাঠে ৯/ হেমন্তের পরশে ১০/পদ্মার পাড় , ইত্যাদি।            

প্রকৃতপক্ষে ইউনুছ ইবনে জয়নালের "এখানে অবারিত মাঠে" কাব্য গ্রন্থটির প্রতিটি   কবিতাতেই গ্রামিণ জনপদের কথা ফুটে ওঠেছে। বেশ পরিশ্রমি  গ্রামিণ কবি ইউনুছ  ইবনে  জয়নাল তার মেধার স্ফুরণ ঘটিয়েছেন বইটিতে। ৫৩টি বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য্যের কবিতায় ভরপুর "এখানে অবারিত মাঠে" বইটি প্রকাশ করেছেন 
"অক্ষর পাবলিকেশন্স এন্ড মিডিয়া" লন্ডন - ঢাকা। বইটির ভূমিকা লিখেছেন " কলম সাহিত্য সংসদ লন্ডন ' এর প্রতিষ্টাতা ডঃ নজরুল ইসলাম হাবিবী।  বইটি লেখকের প্রথম কাব্য গ্রন্থ হিসেবে বেশ কিছু ছোট খাটো ভুল ত্রুটি রয়ে গেছে। বাংলার প্রকৃতির উপমা ব্যবহারে কবিকে আরো সাবধানি হতে হবে। মেদবহুল কবিতা না লিখে  শব্দ চয়নে আরো বেশি পারঙ্গমতা দেখাতে হবে।  নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে পরের বইতে নিশ্চয় কবি এসমস্ত ভুলগুলো সহজেই উথরে যাবেন।     

রতন কুমার তুরী
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।