অটোয়া, রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
কুহেলিকা - স্বাগতম দে

     বান্ধবীর বোনের জন্মদিন থেকে বাড়ি ফিরছি। মানিকতলা বাসস্টান্ডে চাটার্ড বাসটা থেকে নেমেছি সবে। ঘড়িতে সময় দেখলাম - কাঁটায় কাঁটায় পৌনে  এগারোটা। রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলোও ঝাঁপ ফেলে দিয়েছে। নির্জন চারিদিক। মাঝে মাঝে দু' একটা প্রাইভেট গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম একটু। নাহ্, যা ভেবেছি ঠিক তাই। না রিকশা স্ট্যান্ডে কোনো রিকশা আছে, না টোটো স্ট্যান্ডে কোনো টোটো।
     শুনশান রাস্তা। রিকশা বা টোটোর জন্য আর কোনো অপেক্ষা করব না। হাঁটাই লাগাব যখন ভাবছি তখন হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন একটা রিকশা সামনে এসে দাঁড়াল।
      "বাবু যাবেন ?" , জিজ্ঞেস করল রিকশাওয়ালা।
     আমি যেন হাতে চাঁদ পেলাম, এহেনাবস্থা।
     জিজ্ঞাসা করলাম, "ব্রাহ্মণ পাড়া যাবে?"
     "যাব বাবু। বসুন।" বলল রিকশাওয়ালা।
       আমিও সত্তর উঠে পড়লাম রিকশায়। "ভাগ্যিস তুমি এলে, নইলে এতটা রাস্তা আমাকে হেঁটেই যেতে হত।"
     "চন্দ্রভিলায় একজনকে নামিয়েই ফিরছিলাম। আপনাকে দেখে এসে দাঁড়ালাম।"
     "ভালোই করেছ, নাও চলো।"
      রিকশাচালক প্যাডেলে চাপ দেয়।

     পৌষ মাস চলছে। গত ক'দিন ধরে সন্ধ্যে থেকে কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে এই দক্ষিণবঙ্গের হালিশহর নামের একটি মফসসল শহর। আজও তার ব্যতিক্রম নেই। ঘন কুহেলিকায় চতুর্দিক সাদায় সাদা হয়ে গেছে। তেমনি কনকনে ঠান্ডাও বইছে বাইরে। আমি ভালো করে গায়ে চাদরটা জড়িয়ে নিই।
     বাসস্ট্যান্ডকে বাঁ-পাশে রেখে নতুনপট্টির রাস্তা ধরল রিকশাওয়ালা। রিকশা চলেছে অতি মন্থর গতিতে। আর একটু এগোতেই বুঝতে পারলাম। রিকশা টানতে কষ্ট হচ্ছে চালকের। অতি কষ্টে যেন প্যাডেলে চাপ দিচ্ছে। আর অস্ফুট একটা গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসছে লোকটার গলা থেকে।
     "কী হল, শরীর খারাপ লাগছে?", জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
     "কিচ্ছু না বাবু", অতি ধীর গতিতে প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে অস্ফুট স্বরে বলল লোকটা। রিকশা চলতে থাকে ওইভাবেই, অতি মন্থর গতিতেই।

      মানিকতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে মোটামুটি বারো মিনিট লাগে আমার বাড়ি যেতে। কিন্তু সেই বারো মিনিটের রাস্তা কুড়ি মিনিট পার করে রিকশা এসে দাঁড়াল আমার বাড়ির সামনে। বিরক্তমুখে রিকশা থেকে নেমে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে রিকশাওয়ালার দিকে ভালো করে তাকালাম।
     শীর্ণ চেহারার মানুষটার মুখে-চোখে অসুস্থতার ছাপ।
     ভাড়াটা এগিয়ে দিয়ে বলি, "তোমার কি শরীর খারাপ নাকি?"
     "না বাবু, তেমন কিছু নয়, একটু জ্বর জ্বর মতন হয়েছে।"
     হঠাৎ কি মনে হল জানি না, লোকটার কপালে হাত দিতেই সচকিতে উঠলাম।
     "তোমার গায়ে তো ভালো জ্বর, এই নিয়ে রিকশা চালাচ্ছ, তাও শীতের রাতে, কীভাবে?"

     এবার আমার চোখে চোখ রেখে লোকটা বলল, "আমার একটা মাত্তর মেয়ে বাবু। নাম - বিতাসা।"
     আমি বললাম, "বিতাসা কি?"
     "বিতাসা মাঝি, ছয়ের কেলাস থেকে এবারে পেথ্থোম হয়ে সাতের কেলাসে উঠেছে বাবু। আজই রেজাল বেরিয়েছে। বাবু, না মেয়েটাকে খাওয়াতে পারি, না মেয়েটাকে ভালো কিছু দিতে পারি। যদিও ও কোনোদিন কিচ্ছুটি চায় না মুখ ফুটে। ও খুব বোঝে ওর বাপের কষ্ট।",বলে দু'চোখের জল মোছে রিকশাওয়ালা।
     আমিও ওর কাঁধে হাত রাখি। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করে রিকশাওয়ালা,  "পোতি বছর ওর সব বন্ধুরা কোথায় কোথায় বেড়াতে যায়। মেয়ে গল্প শোনে ওদের কাছে, ও-ও তো ছোটো, ওরও মন চায় যেতে।
     তাই এবার আমি ঠিক করেছি বাবু, সামনের শুক্কুর বার তো বড়োদিন , সেদিন ওকে বেড়াতে নিয়ে যাব কলকেতে। আমার তো অতো খেমতা নেই দূরে নিয়ে গে পাহাড়, সাগর দেখানোর। তাই বাবু ঠিক করেছি, কলকেতেয় নিয়ে গে শুক্কুর, শনি আর রোববার ঘুরিয়ে সব দেখাব ওকে - চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, কালীঘাট, ভিকটোরী, হাওড়া ব্রিজ, আর কী সব আছে দেখাব। শুনেছি বড়োদিনের সময় নাকি কলকেতেয় খুব জাঁক হয়। তা বাবু এসবের জন্য তো টাকা চাই। মাঝে তো আর দু'দিন বাকি বাবু। জ্বরেরে কষ্ট একটু আছে বটে বাবু কিন্তু মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে আমি এর চেয়েও হাজার গুণ কষ্ট সহ্য করতে রাজি।"
     টানা কথাগুলো বলতেই হাঁপাচ্ছিল লোকটা। একটু থেমে , "না, বাবু যাই।"
     বলতে বলতেই লোকটা রিকশায় চড়ে বসল এবং আলতো করে প্যাডেলে চাপ দিল।
     "যদি আর কোনো লোক দেখতে পাই" - বলতে বলতে শীতের রাতে ঘন কুহেলিকার মধ্যে যেন হারিয়ে গেল লোকটা।

 স্বাগতম দে
 আনরবাটী, আঁটপুর, হুগলী