অটোয়া, বুধবার ৮ এপ্রিল, ২০২০
স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প এবং পাঠ প্রতিক্রিয়া - আলম তৌহিদ

''স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প'' নামটার মধ্যে একটা আকর্ষণ সহজেই বই পিপাসুদের প্রলুদ্ধ করে। মানিক বৈরাগীর বাসায় বইটি দেখতে পেয়ে তেমনি প্রলুদ্ধ হয়ে চেয়ে নিই পাঠ করার জন্যে। বইটি পাঠ শেষে উপলব্ধি করলাম গল্পগুলোর প্যাটার্ন, বুনন কৌশলে আধুনিক কাব্যিক মেজাজ আমার অন্তরাত্মায় জাগিয়ে দিল এক পাঠসুখ সুরভী। পাঠক হিসেবে একটা প্রতিক্রিয়া লেখার জন্য অন্তর তাগিদ অনুভব করতে লাগলাম। 

গল্পের আঙ্গিকগত পরিসর বড় হলে তাকে বড় গল্প বলা যায়, কিন্তু পরিসর ছোট হলে তাকে ছোটগল্প বলা যায়না। কারণ ছোটগল্পের রয়েছে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য। ছোটগল্প রচিত হয় জীবনের বিশেষ কোন খণ্ডিত অংশ নিয়ে, যেখানে বর্ণনা হয় রসঘন, নিবিড় ও বাহুল্যবর্জিত। এতে পাত্রপাত্রি বা চরিত্রের সংখ্যা হয় খুব সীমিত। গল্পের শুরু এবং পরিসমাপ্তিতে থাকে নাটকীয় মেজাজ। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে পারি। তিনি 'সোনারতরী' কাব্যে 'বর্ষাযাপন' কবিতায় লিখেন- 

"ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা, ছোটো ছোটো দুঃখকথা 
নিতান্ত সহজ সরল, 
সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি 
তারি দু-চারটি অশ্রু জল। 
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা, 
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ। 
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে 
শেষ হয়ে হইল না শেষ।"  

ছোটগল্পের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্য যদিও প্রাসঙ্গিক, তবে একে সার্বিক ছোটগল্প বিচারের মাপকাঠি বলা যাবেনা। কারণ এর বাইরেও আরও বৈশিষ্ট্য সমন্বিত ছোটগল্প বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে। মোশতাক আহমদের এই গ্রন্থটির গল্পগুলোকে সার্বিক বিচারে ছোটগল্পই বলা যায়।  

গ্রন্থটিতে এগারোটি গল্প আছে। প্রথম গল্পের শিরোনাম 'হন্তারক'। গল্পের শুরু হয়েছে স্বয়ং লেখক ও তার এক কবিবন্ধু রাশিদুল আনোয়ারকে উপজীব্য করে। ইনিয়ে বিনিয়ে কোন ভূমিকার অবতারণা না করে শুরুতেই নাটকীয় আবহ সৃষ্টি করেছেন মোশতাক। তার উপস্থাপনার চমৎকারিত্বে পাঠকের মনে এই ধারণার উদয় হয় যে,এ যেন গল্প নয় লেখকের জীবনঘনিষ্ঠ সত্য ঘটনার অবতারণা। গল্পের সাথে পাঠকের একান্ত সংযোগ সৃষ্টি করতে পারা নিঃসন্দেহে গল্পকারের কৃতিত্ব বলে মানতেই হয়। এই গল্পে লেখককে আমরা পাই একজন সম্পাদকের চরিত্রে। সেই সুবাদে তিনি তার কবিবন্ধুর সাতাশ-আটাশ বছর জীবনকে ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। তখন রাশিদুল আনোয়ার ছিলেন একজন আপাদমস্তক কবি। কিন্তু এর পরবর্তী জীবনে রাশিদুল আনোয়ারের কবিসত্তায় নেমে আসে বিপর্যয়। তার লেখার মান হয়ে গেছে নিম্নগামী। তার অনেক ব্যাখ্যা সম্পাদক বন্ধুর কাছে লিখা চিঠি থেকে আমরা জানতে পারি। কিন্তু লেখক আমাদের আরও একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। লেখক বলেন-''তো, সাতাশ-আটাশের পর তার অন্যজীবন শুরু হয়েছে, 'আবার না ভোর হতে/বাজারের থলি হাতে'।'' 

অর্থাৎ রাশিদুল আনোয়ার যে বিয়ে করে সংসার ধর্মে প্রবেশ করেছেন উক্ত দুটি কবিতার পংতির মাধ্যমে লেখক আমাদের সেই ধারণাই দিয়েছেন। লেখকের এই কৌশলী উপস্থাপনা যথেষ্ট শিল্পসম্মত বলা যায়।

ছা-পোষা জীবনে একজন কবির লিখতে না পারার ব্যর্থতার গ্লানি, মানসিক যন্ত্রণা, নিজেকে প্রতিবন্দী ভাবা এবং পরিণতিতে দুর্ঘটনায় মৃত্যু-লেখকের বর্ণনা শৈলীতে পাঠকের মানসজগতে বাস্তবঘটনার মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রাশিদুল আনোয়ারের মৃত্যুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা না করে লেখক নাটকীয়ভাবে গল্পের পরিসমাপ্তি টেনে একটি সফল ছোটগল্পের অবতারণা করেছেন। কিন্তু আমরা বিস্মিত হই জীবনানন্দের সাথে রাশিদুল আনোয়ারের চরিত্রের একটা যোগসূত্র তৈরি হতে দেখে।   

মোশতাক আহমদ হুজুগে গল্প লিখেছেন এমনটি কখনো মনে হয়নি। তার মধ্যে পরিদৃষ্ট হয় এক সচেতন গল্পকারের বৈশিষ্ট্য। ঐতিহ্যগত ধারা থেকে সরে এসে অধুনিক ও নাটকীয় আবহের পরিশীলিত এবং সৌন্দর্যবোধের ছাপ তার গল্পে দেখা যায়। তার গল্পে নেই অতিরিক্ত বাহুল্য ও অতিকথনের মতো পাঠ অবসাদ। 'ভুল মানুষ' গল্পে আমরা সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। গল্পের নায়ক আবিদ জাফর। গল্পকার পরিমিত কথার মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন তার রাজনৈতিক, রোমান্স ও চাকরি জীবনের কথা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে আবিদের রাজনৈতিক স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। মিছিলে এক তরুণী সহযোদ্ধাকে পেয়েছিল সহচরী হিসেবে, কিন্তু ঘরবাঁধা হয়ে ওঠেনি। চাকরিতেও শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে দেখিনা তাকে। জীবনের তিন কাল কাটিয়ে আবির যখন আটত্রিশ-ঊনচল্লিশে উপনীত, তখনও কিন্তু জীবনের আশা শেষ হয়ে যায়না। গল্পকার ইচ্ছে করলে তাকে বিয়ে-থা করিয়ে সংসারধর্মে প্রবেশ করাতে পারতেন। কিন্তু আবিদ জাফর যে একজন ভুল মানুষ। তাই তাকে ভাবনার মধ্যে ফেলে দিয়ে গল্প শেষ করেছেন।   

'অসামান্য অতিথি' গল্পটির অবয়ব গড়ে ওঠেছে গল্পকারের আত্মকথনের মধ্য দিয়ে। মোশতাক কেবল গল্পকার নন, তার যে একটা কবিসত্তাও আছে, এই গল্পে এরই ছাপচিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। শব্দ-বাক্য প্রয়োগে দেখা যায় চমৎকার শৈলী। এই গল্পে গল্পকারের ভাষাগত দক্ষতা নিঃসন্দেহে পাঠককে মুগ্ধ করে। জলের নিচে ও ওপরে বসবাস, বৃষ্টির মাহাত্ম্য অনুধাবন ও পার্থিব জীবনের দমকা স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে  গল্পকার উপলব্ধি করেন সব কথা এক সাথে বেরিয়ে যাওয়ার তাড়না। এই গল্পে যে গল্পকারের কবিসত্তার প্রতিফলন ঘটেছে, তার একটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরলাম। তিনি লিখেন- 

''---মনে হয় এই তো সেদিন, সন্ধ্যাকে উপেক্ষা করে গলির মুখে হেঁটে এলো চাঁদমুখ : বাহুমূলে চিবুকে এলোচুলে ল্যাম্পপোষ্টের ফ্লুরোসেন্ট আলো ম্রিয়মাণ। গুনগুন নির্মলা মিশ্র, পায়ের শব্দ ফিরে গেল ঘরে। আট বছর ধরে এই দৃশ্য ডেকে চলল ক্রমাগত। তারপর থেকে দেয়ালঘড়ির পেন্ডুলাম হয়েছি সারা রাত এধার ওধার। ভোর হয়, ক্লান্ত লাল চোখ। দুপুর নিঃসাড় হয় উতরোল ঘুমে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আসছে আবার, 'বহুযুগের ওপার হতে' আষাঢ় ছন্দে তুমি আসছো প্রজাপতি যেনবা, সর্বনেশে ঘড়ির চাবি যেনবা। আবার সারা তরুণ উদ্যমে বারান্দার এধার ওধার করি পেন্ডুলামের মুদ্রায়।'' 

হায়দার ও জিনিয়ার প্রেম-ঘরবাঁধা ও বিচ্ছেদকে উপজীব্য করে রচিত 'নিঃসঙ্গ মারমেইড' চমৎকার প্রেমের গল্প। তবে এই গল্পের বিশেষত্ব হচ্ছে, গল্পকার স্বল্পপরিসরে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানকে গল্পের অপরিহার্য অংশ করে তুলেছেন। গল্প পাঠে প্রেম আর ভ্রমণ যেন সমান্তরাল হয়ে ওঠে। যেমন গল্পের নায়িকা জিনিয়ার সাথে হায়দারের পরিচয় ঘটিয়েছেন কক্সবাজারে। এই পরিচয় পর্বে স্থানীয় সাংবাদিক মানিক বৈরাগীর ভূমিকাটাই গল্পের মূল টার্নিং পয়েন্ট। বিয়ের পর হায়দার ও জিনিয়া কর্মসূত্রে চলে গেল এলদোরাদো শহরে। সেখানে বিচ্ছেদ। আবার গ্রানভিল আইল্যান্ডে উভয়ের দেখা হতে হতেও যেন দেখা হলো না। আর তাদের সাক্ষাৎ না হওয়াটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ জিনিয়া তো নিঃসঙ্গ মারমেইড।     

আমরা জানি মোশতাক আহমদ পেশায় একজন চিকিৎসক। 'ত্রাণ-পরিত্রাণ' গল্পের প্রধান চরিত্রটিও একজন চিকিৎসকের। উত্তম পুরুষের মুখের ভাষ্যে এই গল্পটি রচিত হয়েছে। গল্পে গল্পকারের ব্যক্তিগত জীবনের ছায়াপাত আছে বলে মনে হয়। যথেষ্ট মানবিক আবেদন সম্বলিত এই গল্পে লেখক ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন মানুষকে। গল্পের পার্শ্বচরিত্রগুলো যেন বাস্তবতার ভুঁইফুঁড়ে জন্ম নেয়া আমাদের সমাজে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এক একজন মানুষ। হতভাগ্য সাবেক ফুটবলার ভলান্টিয়ার শামসুর চরিত্র যেমন আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে, তেমনি নৈতিক স্খলিত লুতফরের প্রতি জেগে ওঠে ঘৃণা। গল্পকার দুই চরিতের তুলনা টেনে এগিয়ে রেখেছে শামসুকে। আর গল্পটি হয়ে ওঠে দীপ্তিময়। এখানেই গল্পকারের সার্থকতা। 

সাহিত্যে ম্যাজিক রিয়ালিজম বা যাদুবাস্তবতার উৎপত্তি হয়েছিল ইউরোপে। স্পেন হয়ে সেটি ছড়িয়েছে ল্যাটিন আমেরিকায়। তারপর থেকে সেখানকার সাহিত্যে ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রভাব প্রকট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে হোর্সে লুইস বোর্হেস ও গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের হাতে এটি বিশেষমাত্রা পায়। আক্তারুজ্জামান ইলিয়াসের 'খোয়াবনামা' উপন্যাসে, শহীদুল জহিরের 'আমাদের বকুল', 'কাঠুরে ও দাঁড়কাক' ও 'ধুলোর দিনে ফেরা' গল্পে ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। তাঁরা ল্যাটিন প্রভাবিত হলেও তাঁদের গল্পের উপকরণ একান্ত দেশজ। মোশতাকের 'কৃষ্ণচূড়ার গল্প'টিও পরাবাস্তবতার আবহ ছড়িয়ে দেয় পাঠকের মনে। গল্পে অপ্রকৃতিস্থ এক লোকের চরিত্র আছে, আর আছে রমনার কৃষ্ণচুড়া গাছ। লোকটা কৃষ্ণচূড়া গাছের কথা শুনতে পায়, যে গাছে ফাল্গুনের 'মাগরিবের অক্তে' মিশে গিয়েছিল বায়ান্নের ভাষা সৈনিক বরকত। অর্থাৎ গাছও এই গল্পে একটি চরিত্র। লোকটি গাছের মুখেই বরকতের শেষ কথাগুলো শুনেছিল। কী সেই কথা ! গল্পকারের বয়ানে শুনি- 

''ঐ যে লম্বা করে ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো, গেল বর্ষায় মানিকগঞ্জের বাড়ি গিয়ে পানচিনি হয়ে গেছিলো। মেয়েটার সাথে একটু কথা বলার কোনো উপায় কী আর ছিল সেই একান্ন সালের আষাঢ় মাসে ? মেয়েটার পটলচেরা চোখ দুটো খুব টানতো। ওদের বাড়ির পাশের আম গাছে ওঠার ছলে দু একবার মেয়েটার উঠোনে উড়ে বেড়ানো প্রজাপতিটাকে দেখেছিল আবুল বরকত। ভেবেছিল, এই প্রজাপতিটাকে তার চাই, একান্তের করে চাই।''   

গ্রন্থের শেষ গল্প 'তরমুজ শিল্পের ইতিহাস'। মোশতাক গল্পটি শুরু করার পূর্বে একটি নোট দিয়েছেন। সেখান থেকে জানা যায় গল্পটি রচিত হয়েছে শহীদুল জহিরের 'আমাদের কুঠির শিল্পের ইতিহাস' গল্পকে উপজীব্য করে। সুতরাং আমাদের আর বেগ পেতে হয়না গল্পের চরিত্র উদ্ধার করতে। 'আমাদের কুঠির শিল্পের ইতিহাস' গল্পের মূল বিষয়বস্তু হলো তরমুজ উৎপাদন ও বিভিন্ন বিপণন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো। পটভূমি সেই সময়ের গৌরব হারানো পুরান ঢাকার একটি বিশেষ অঞ্চল। চরিত্রের মুখে জুড়ে দিয়েছেন ঢাকার স্থানীয় ভাষা। এই গল্পের রাজনৈতিক দিকটিও ছিল ততোধিক গুরুত্ববহ। বিশ্ব পুঁজির দাপটে তৃতীয় বিশ্বের ব্যবসায়ীরা যে কোনটাসা হয়ে পড়ে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে যে পরিবর্তন ঘটে যায়, শহীদুল জহিরের গল্পে তাও দৃশ্যমান হয়ে ওঠেছে। 

মোশতাকের 'তরমুজ শিল্পের ইতিহাস' গল্পটিও তরমুজের উৎপাদন, বিপণন, গুণগত মান এবং ভোক্তা-বিক্রেতা সম্পর্ক নিয়ে পুরান ঢাকার পটভূমিতে গড়ে ওঠেছে। তবে মোশতাক ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে কিভাবে নতুন ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়ে যায়, তাও নিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন। তাই আমরা দেখতে পাই 'হাজী রশিদ সরদার ফুড প্রডাক্টস কোং' বিভাজিত হয়ে আরও একটি প্রতিষ্ঠান 'নিউ হাজী রশিদ সরদার ফুড প্রডাক্টস কোং' সৃষ্টি হতে। গল্পের মূল চরিত্রে আছে সহিদুল্লা জহির নামে এক যুবক, যে কোনো কোনো পূর্ণিমা রাতে ফ্যাক্টরির কোণা থেকে ফুলের গন্ধ পায়। সেই গন্ধ হাসনাহেনা কিংবা শেফালি ফুলের। হাসনাহেনা গন্ধ ছড়ালে সাপের ছদ্মবেশে যে মৃত্যু আসতে পারে সে ব্যাপারেও তাকে সচেতন থাকতে দেখি। আবার শেফালি নামের সাথে রয়েছে তার ইস্কুল জীবনের স্মৃতিও। দেয়ালের গায়ে ইটের খোয়ার পেন্সিলে 'শেপালি + সহিদুল' লেখাটি নজরে এলে তার সেই স্মৃতি মনে পড়ে যায়। এই লেখাটি হচ্ছে একটি প্রেমের সিম্বল। গল্পকার সচেতন ভাবেই সহিদুলের প্রেমকে জীবন দেননি। তাই তার জীবনে কখনো আসেনি কবিতার স্বাদও। হয়ত তাই হাসনাহেনার গন্ধ এবং সবুজ সাপের ক্যামোফ্লেজ তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। আর মোশতাক দক্ষতার সাথে বাঁচিয়ে রাখেন তরমুজ শিল্পকে।

স্বাধীনতা পরবর্তী রচিত ছোট গল্পে বক্তব্যধর্মীতার চেয়ে নিরীক্ষাধর্মীতা প্রাধান্য লাভ করে। ঐতিহ্যগত কাঠামো থেকে সরে এসে লেখকরা নতুন প্যাটার্নের দিকে মনযোগী হন। মোশতাকও সেই ঘরানার গল্পকার। তার আঙ্গিকগত সচেতনতা পাঠকের নজর কাড়ে। তার গল্প বলার ঢংয়ে কোনো জড়তা নেই, আছে স্মার্টনেস অভিব্যক্তির অনিন্দ্য প্রকাশ। অতীতের মায়াবী পর্দা ছিন্ন করে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনা, শব্দ-বাক্য গঠনে কবিতার আবহ সৃষ্টি, অধরা প্রেম, চিত্রকল্প, বাস্তব-পরাবাস্তবতার চমক, বাহ্যিক ও অন্তর্গত সম্পর্কের কম্বিনেশন, সবকিছু মিলিয়ে 'স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প' গ্রন্থটি সুপাঠ্য একথা মানতেই হয়।

লেখক- 
আলম তৌহিদ
কবি-প্রাবন্ধিক-গল্পকার
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ