অটোয়া, রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
কালিশূন্য সেই কলমটা - তন্ময় সিংহ রায়

কটা আধবুড়ো বকুল গাছ, সামনেই তার হাত দশেক চওড়া নদী। সোনালী আলোর সাথে জলের নিবিড় সম্পর্ক, আশেপাশের বিভিন্ন গাছগাছালি, চাষের ক্ষেত, কয়েকটা কাঁচা ও আধকাঁচা বাড়ি-ঘর এবং পাখীর কলরবে মনে হত গ্রাম-টা তার অপরূপ সৌন্দর্যে কেমন যেন অহংবোধে জর্জরিত। 
যাইহোক, ওই বকুল গাছের আশ্রয়েই ছিল ছাব্বিশ ও একত্রিশ-এর দুটো সতেজ হৃদয়ের প্রকৃত ভালোবাসার মনের ভাব আদান-প্রদানের আদর্শ জায়গা।  
টুং-টাং! ঝুন-ঝুন! শব্দেই অধীর আগ্রহে থাকা আমার এই আবেগপূর্ণ মনটা উঠতো নেচে, খুশির আনন্দে! বুকে হাত না রেখেই অনুভব করতাম হৃদপিন্ডটা কেমন যেন হয়ে উঠেছে অস্থির!
মনে হত পৃথিবীর সব সুখগুলোকে যেন কেউ চুড়ান্ত বিশ্বাসে কিছু সময়ের জন্যে আমার কাছে গচ্ছিত রেখে গেছে! 
ভোরের সদ্য ফোটা গোলাপ, গোধূলিতে ঝাঁক বেঁধে বৈচিত্র্যময় পাখির স্বশব্দে নিশ্চিন্তে ঘরে ফেরা অথবা ওই উঁচু পাহাড়ের চুড়ায় নানা রঙের খেলা!
প্রকৃতির সব সৌন্দর্য-ই যেন একত্রে এসে  উপস্থিত হত আমার কাছে। 
নূপুর ও গোলাপি-নীল কাঁচের চুড়িসমেত তোমার  সম্পূর্ণ শরীরটা যখন অবস্থান করতো আমার পাশে এসে।
যত্ন করে কাজল আঁকা তোমার হাঁসি হাঁসি মুখের চোখদুটো যখন কেড়ে নিতো আমার দৃষ্টিকে, মনে হত মৃত্যুকেও আমি করতে পারি  তুচ্ছ!
কি অসম্ভব চৌম্বকীয় শক্তি ছিল তোমার ওই দৃষ্টিতে! 
আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, বাবার দেওয়া হাত খরচের পয়সা জমিয়ে তুমি আমায় কিনে দিয়েছিলে একটা কালির কলম, বলেছিলে 'তুমি খুব ভালো লেখো।'
'আমার ভালোবাসার এই ছোট্ট উপহারটা আমি  তোমায় দিলাম, তোমার সৃষ্টি সৃষ্টি হবে আমাকে জড়িয়েই,' বলেছিলাম, 'তোমার ভালোবেসে দেওয়া এই অমূল্য উপহারে আমার কব্জি হবে সমৃদ্ধ! অনেক সৃষ্টি করবো আমি আর সেই সৃষ্টির প্রতিটা উষালগ্নে থাকবে শুধু তোমার-ই সু-বাস!  
তবে একটা বিশেষ অনুরোধ থাকবে তোমার কাছে, এ কলম দেহে কালি যদি বরণ করে মৃত্যু তবে, অক্সিজেনটা বারেবার তুমি-ই দিও আমাকে।'
তোমার চোখে-মুখে ঝরে পড়েছিল প্রবল খুশির বৃষ্টি! 
একবার তোমার হাত ধরে উঠতে গিয়ে আমি  গেলাম ধপাস্ করে প্রায় গড়িয়ে পড়ে! 
সে কি হাঁসিটাই না তুমি ছিলে হেঁসে!
কি অবর্ণনীয় রূপ ছিল সে প্রাণখোলা মিষ্টি হাঁসির! 
মনে মনে ভাবছিলাম, এ হাঁসি একান্তই আমার বহু মূল্যবান সম্পদ!  
এ কোহিনুরের একমাত্র নিশ্চিন্ত বাসস্থান, আমার হৃদপিন্ড। 
অবশেষে তোমাকে অনিচ্ছাকৃত থামাতে গিয়ে আমিও হয়েছিলাম তোমার হাঁসির একমাত্র সঙ্গী। 
তোমার দ্বিতীয়বারের সাহায্যের হাতটাকে আমি ধরেছিলাম ঠিক-ই কিন্তু তোমার অপরূপ স্নিগ্ধ ও মায়াবী হাঁসির টুকরোগুলো মনে হচ্ছিল কেমন যেন মুহুর্তের মধ্যে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে আমার রক্তের প্রতিটা কণায়! 
কোনো হুঁশ ছিল না আমার কিছু সময়ের জন্যে, অপলক দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ডুবে গেছিলাম তোমার রেটিনাতে!
ভেসে উঠলাম ওই সাদা-ছাই রঙা রাজ হাঁসটার ঝপাস্ করে জলে লাফ দেওয়ার শব্দে।   
আমার হৃদপিন্ডকে পরম আবেশে কতদিন জড়িয়ে ছিল তোমার ছন্নছাড়া ঘন কালো চুলগুলো।
এ বুকে কতদিন গহীন অনুভব করেছি তোমার উষ্ণতাকে!
আমার শিরা-উপশিরায় বইতে শুধু তুমি!

জীবনের কতগুলো রাত, কতগুলো দিন শুধু তোমার এই মাত্রাতিরিক্ত অসহনীয় মধুর স্মৃতিগুলোকে রক্তাক্ত বুকে চেপে আজ ৪১ বছর পর আমি তোমাদের সেই গ্রামের সেই জায়গায়। 
খসখসে, পাতলা ও অমসৃণ দুর্বল চামড়ার নিচ থেকে ঘুমন্ত শিরার জেগে ওঠা ও চুলে ক্লোরোফিলের অভাব জানিয়ে দেয়, সত্যি বয়েস হয়েছে।
ডাক্তার বলেছেন... 'হার্ট আপনার কমজোরি হয়ে গেছে!'... চশমা ছাড়া চোখেও দেখতে পাইনা ভালো!
নিজের অগোছালো জীবনের গোধুলীলগ্নে  দাঁড়িয়ে যন্ত্রনাটা আজ বড় বেশি কর্তৃত্ব ফলাচ্ছে এ জীর্ণ বুকটায়! 
কেন বারে বারেই মনে হচ্ছে আমি আবার পড়ে যাবো আর তুমি আসবে তোমার চুড়িমাখা সাহায্যের হাতদুখানা বাড়িয়ে দিয়ে ভালোবেসে আমায় তুলতে। 
অপরূপ তোমার সেই হাঁসিটায় আমি আবার ডুবে যাবো, তোমার যত্নে আঁকা কাজল চোখে নিজেকে আবার আমি হারাবো! 
আজও ভাবি, তোমার আর একটা হাঁসিও কি আমি আর এ জীবনে দেখতে পাবো না? 
হঠাৎ-ই হাত রাখি হৃদপিন্ডে! 'কই আমার কোহিনুর তো নেই! কোথায় গেলো আমার সম্পদ?'
তোমার গন্ধে ভরা সেই জায়গায় আমার দুর্বল অশ্রুগ্রন্থী থেকে অবিশ্রান্ত ধারায় নেমে আসে  জল, শুধু একটা বার তুমি দেখে যাও!                                                          

অফিসের কয়েকমাসের গ্রীষ্মকালিন ছুটিতে মাকে নিয়ে এসেছিলাম মামার বাড়িতে। সম্মানের চাকরি হলেও মাইনেটা ছিল বেশ কম, তাই তোমার বড়লোক বাবা কিছুতেই যোগ হতে দেয়নি আমাদের দুটো হৃদয়কে! বোঝেননি প্রকৃত ভালোবাসার সম্মান মর্যাদা ও তাৎপর্যকে!
এমনকি তোমাদের গ্রামের মোড়লকে ডেকে লোকবলে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল তোমায় জোর করেই, কি কষ্টটাই না পেয়েছিলে তুমি!
কড়া নিরাপত্তার বলয়কে উপেক্ষা করেও বারে বারে তুমিসহ আমিও ছিলাম ব্যর্থ!

জানোতো, সেই বকুল গাছটা আজ আর বেঁচে নেই! আমার সৃষ্টিও গেছে মরে!
কাকে জানাবো আমার এই নিদারুণ মর্মস্পর্শী করুণ কাহিনি! 
পাহাড়প্রমাণ যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে আজও তুমি জীবন্ত এ হৃদয়ে!
আজ জীবনের শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে তোমার কি আমার কথা আমার-ই মতন মনে পড়ে? 
অন্তত মাঝে মাঝে? বহুদিন পরে হলেও একবার?  
কত প্রশ্ন জন্ম নেয় আজও নিঃসঙ্গ, অসহায় এই মনে!
উত্তরের আশায় ব্যর্থ হয়ে আবার মৃত্যুও হয় এই শীর্ণ বুকেই!
চোখের সামনে তুমি নেই, আছো হৃদয়ে!
পড়ে আছে একবুক যন্ত্রনাময় স্মৃতি আর অতি যত্নে পড়ে আছে তোমার দেওয়া কালিশূন্য সেই কলমটা!!

তন্ময় সিংহ রায় । সোনারপুর,কোলকাতা