অটোয়া, বুধবার ৮ এপ্রিল, ২০২০
কবিতার শব্দাবলী - মুহাঃ হাবিবুর রহমান

ধরাতে ঘুম ভাঙলো লোকটির। শীতের রাত চারিদিকে নীরবতা। এমন সময় ঘুম ভাঙা মানে এক ধরনের বিষন্নতা ভর করে। লোকটির লোকটির বেলায় ও তার ব্যতিক্রম হলোনা। কন কনে ঠান্ডার মধ্যে লোকটি হাত বাড়ালেন। পাশের টেবিলে রাখা পানির গ্লাস ধরে ঢকঢক করে পানি পান করলেন। অনন্ত তৃষ্ঞার যবনিকাপাত হলো। কিছুটা হলেও অন্তরে শান্তি পেলেন। স্বপ্নের কথাটি বারবার মনে পড়ছে। এই মাত্র যে স্বপ্ন দেখে ঘুম বেঙে গেল তার। বারবার লোক না বলে তার নামটা বলা যাক। এই গল্পের প্রধান চরিত্র এরহাম সিদ্দিকি। বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ হবে। একটু বেশীও হতে পারে। এরহাম সাহেব বিপত্নীক। মাস পাচেক আগে তার স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে। এক ছেলে দুই মেয়ে সবাই দেশের বাইরে থাকে। এরহাম সাহেব পেশায় একজন কবি। সবাই শুনে হাসতেও পারেন। বরওে পারেন কারো পেশা আবার কবি হয় নাকি? সে প্রশ্নের উত্তরে যাবনা শুধু বলবো এরহাম সাহেবের পেশা কবিতা লেখা- সেই সূত্রে তিনি কবি। 

এরহাম সাহেবের কিছুক্ষণ আগে দেখা স্বপ্নটি অদ্ভুদ ধরনের। ঘুমের মধ্যে তিনি দেখছেন একজন শুভ্র বসনা বৃদ্ধা তাকে বলছে এইযে, কবি আমি আপনার কবিতার শে^ত শব্দাবলী, আমাকে সাজাতে হবে কবিতার মাঝে তোমার মনের মাধুরী দিয়ে। অতঃপর বৃদ্ধাটি কাছে আসলেন এরহাম সাহেবের গলার টুটি চেপে ধরে খুব শক্ত হাতে চাপ দিতে থকলেন। এক হাত দিয়ে ছাড়াতে চেষ্টা করলেন অন্য হাতে তার জলন্ত সিগারেট। সিগারেটটি ছুড়ে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম মনে হচ্ছে এই বুঝি মৃত্যু হবে।  গো গো শব্দ হচ্ছে তার গলা দিয়ে। ছাড়ো ছাড়ো বলে চিৎকার করে উঠলেন তিনি। তার পরের ঘটনা- নির্ঘুম রাত। 
টেবিল র‌্যাম্প জারারেন এরহাম। কাতা কলম নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। একটি কবিতা লেখা যায় কিনা? তার বাবনার রাজ্যে অসংখ্য শব্দাবলী কিলবিল করছে। অথচ তিনি একটি লাইনও লিখতে পারছেন না। বৃদ্ধার কথামতো কবিতার শরীর সৃষ্টি করতে তিনি অক্ষম হয়ে পড়েছেন। শেষ মেষ দুলাইন লিখলেন এভাবেই-
কে তুমি ডাকো নিস্তব্দ রাতের বাসরে
মধ্য রাতে নিঃস্বঙ্গ আধারের শেষ প্রহরে?
লাইন দুটি শেষ করে আবা পানি পান করলেন। বুকটা বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে। মুরভ’মির তৃষ্ণা যেন তার বুকের মধ্যে। 
দূরে মসজিদে ভোরের আজান ধনীত হলো। পৃথিবেিত যত ধ্বনী আছে তার মধ্যে সবচেয়ে মধুর লাগে ভোরের আজানের ধ্বনী। এরহাম সাহেবের কাছে তাই শত কষ্টের মধ্যেও এই ভোরে আজান শোনা তৃপ্তির শান্তির। পাঞ্জাবী পরে তিনি বাইরে বের হলেন, ফজরের নামাজ মসজিদে পড়তে হবে। এই কাজে তিনি কখনো দেরী করেন না। 

সকালের নাস্তা খেয়ে বারান্দায় বসলেন। দুলাইন কবিতার সাথে আরো  কিছু যোগ করতে চেষ্টা করেও পারলেন না। একটি চাপা যন্ত্রনা বুকের মধ্যে পাথর হয়ে বসেছে। তিনি ভাবছেন- কেন এমন হয়। আমি কি তাহলে কখনো আর কবিতা লিখতে পারবোনা? কবিতা আমার প্রাণ, বেঁচে থাকবার প্রেরনা। অথচ সেটা আর সৃষ্টি করতে পারছিন। 
সময়টা জুলাই ১৫, রমজান মাস। আকাশে মেঘের ঘনঘটা-থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরছে। বৃষ্টির শব্দেরও একটা আকর্ষণ আছে। এরহাম সিদ্দিকি তার কাব্যিক জগতে সে আকর্ষণ অনুভব করেন। খোলা জানালার পাশে বসে ভাবছেন। জীবনতো ফুরিয়ে যাচ্ছে। ঐ দূরে বয়ে চলা খোলপেটুয়ার জোয়ার ভাটার মতো। মাথার মধ্যে অজস্র শব্দাবলী কিলবিল করছে কিন্ত কবিতা হয়ন। তাহলে কি আমি বন্ধ্যা কবি হয়ে গেলাম? মোবাইলের রিং টোন বাজতেই তিনি রিসিভ করলেন। একটি মেয়ের কন্ঠ। কেমন আছো তুমি? বুষ্টি ভেজা প্রকৃতি দেখলে কি কবিদের মানায়? ওঠো কবিতা লেখ। কিছু বরতে পারলেন না তিনি। হাত থেকে মোবইল পড়ে গেল। দুহাতে মাথা চেপে ধরে চেয়ারে হেলান দিলেন। এর থেকে মুক্তি চাই-ই। খাতা কলম নিয়ে কবিতা লেখার জন্য প্রস্তুত হলেন। শুরু করলেন-
কেন থাকো দূরে
ভরা শ্রাবনে
মেঘ বালিকার উজানে-
এসা ফিরে ধরাতলে 
কর স্নান নব ধারা জলে... 
এই পর্যন্ত লিখে থেমে গেলেন-অতঃপর কি হবে? আরতো ভাষা আসছেনা। রাত কতটা বাজে তার খেয়াল নেই। প্রচন্ড উত্তেজনায় তার শরীর কাঁপছে। অতীতের নানা ঘটনা মনে পড়তে থাকে। দুঃখ বেদনাপ্রাপ্তি আনন্দ সুখের সময় সব মনে পড়ে। সব স¥ৃতির মেলায় তিনি দেখতে পাচ্ছেন। শৈশব কৈশরের রঙিন দিন গুলি। বিড়ালাক্ষীর ঝুরঝুরিয়া খালের উপরে বাঁশের স্যাঁকোর উপর থেকে  লাফিয়ে নিচের নোনা জলের উপর পড়া, বৈশাখের দুপুরে  আমের গুটি পেড়ে নুন দিয়ে খাওয়া। মেী খালের পাশে গেওয়া গাছে নাড়ার দড়ি বেঁধে দোল খাওয়ার আনন্দ। সর্দার পুকুরের বিশাল জলরাশির মধ্যে দল বেধে সাঁতার কাটা, আরো কত কি? একটি দল ছিল পাঁচ সাত জনের হবে। স্কুলের ছুটির পরে সবাই মিলে কত হল্লা মারা হতো-এখন কার দিনের মতো পড়া লেখার অতো চাপ ছিলনা । প্রাইভেট পড়ার চলতো ছিলই না। শিক্ষকগন ছিলেন খুবই আন্তরিক। সকল পড়া ক্লাসে সম্পন্ন করে দিতেন। বাড়তি প্রাইভেটের দরকার হলে বিনা পয়সায় সময় দিতেন। নওয়াবেঁকী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রয়াত প্রধান শিক্ষক আজিজ স্যার ছিলেন তার অন্যতম উদাহরন। 
এরহাম সিদ্দিকি তার সমস্যার ব্যাপারে খুবই চিন্তাগ্রস্থ। সবসময় তাকে আজানা চাপা কষ্ট তাড়া করে ফিরছে। তিনি ঠিক করলেন এর একটা সমাধান করবেনই। নিজের সমস্যা নিজেই সমাধান করার একটা সুখ আছে। চলবে...

মুহাঃ হাবিবুর রহমান । শ্যামনগর, সাতক্ষীরা