অটোয়া, বুধবার ৮ এপ্রিল, ২০২০
রহস্যের মায়াজাল (তিন) - সুজিত বসাক

১৯১২ খৃষ্টাব্দের মে মাস। আফ্রিকা থেকে ফেরার পর ছমাস যেতে না যেতেই আবার একটু একটু করে একঘেয়েমি গ্রাস করতে শুরু করেছিল রাকিবকে। চাকরির সন্ধান করতে করতে এক সাহেবের সহযোগিতায় হাজির হয়েছিল আফ্রিকার অজানা প্রান্তরে। দুই বছরের চাকরি জীবনে সেখানে বিরাট কিছু পরিবর্তন হয়নি রাকিবের। কোন হিরের খনির সন্ধানও পায়নি। তবে আফ্রিকার বিখ্যাত জুলুল্যান্ডের অরন্যাঞ্চলে হারিয়ে যাওয়া একদল মানুষকে সে রক্ষা করেছিল নিজের সাহস আর বুদ্ধি বলে। ছয় জনের সেই দলে দুই জন স্বদেশীয় ছিল,  বাকিরা সব সাহেব। জীবন ফিরে পাওয়া পর্তুগিজ নাগরিক রডরিগো রাকিবকে নিজের দেশে নিয়ে গিয়ে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন। রাকিবের অবশ্য তাতে রাজি হওয়ার কোন প্রশ্নই ছিল না। সেই ঘটনার খবর পৃথিবী ব্যাপী বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হয়েছিল রাকিবের ছবি সহ। সেসব থেকে আয়ও নেহাত মন্দ হয়নি তার। সেই সাথে মিলেছে পরিচিতিও। এখন তাকে দেশ বিদেশের বহু মানুষ চেনে। লোকে বলে রাকিবের পায়ে ঈশ্বর চাকা লাগিয়ে পাঠিয়েছেন। সে নিজেও বোঝে, লোকে বোধহয় খুব একটা ভুল বলে না।  একজায়গায় একভাবে থাকা তার ধাতে নেই। দূরের হাতছানি তাকে পাগল করে দেয়। সেই হাতছানিকে উপেক্ষা করার সাধ্য তার নেই। 

ঠিক এই সময়েই একটা চিঠি পেয়েছিল রাকিব।  ঠিক চিঠি নয়, সেটাকে আমন্ত্রণ পত্র ও বলা যায়। যে সে আমন্ত্রণ পত্র নয়, একজন মহারাজার আমন্ত্রণ।  চিঠির ভাষা ছিল এইরকম :-

সন্মানীয় রাকিব হোসেন চৌধুরী
গোপাল গঞ্জ, খুলনা

প্রথমে আমার নমস্কার নেবেন। আপনার বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার বিবরণ আমি সংবাদপত্র মারফত যেমন পড়েছি, তেমনি আমার এক পরম বন্ধুর কাছেও শুনেছি। চমনলাল। যে আপনাদের ঐ দলটাতে ছিল। চমনলাল এর মুখেই শুনেছি, আপনি বয়সে নেহাতই তরুণ। তবুও আপনাকে শ্রদ্ধা না জানিয়ে  পারছি না। মানুষের কাজ বড়, বয়স নয়। সেই সাথে আপনাকে ছোট্ট একটা অনুরোধ, কদিনের জন্য আমার রাজ্যে এসে আমার আতিথ্য গ্রহণ করুন। আমার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারি, আপনি যা করেছেন সেটা কতটা কঠিন ও দুঃসাধ্য ছিল।  আপনার মতো একজন সাহসী ও মানবতা সম্পন্ন মানুষকে সন্মান প্রদর্শন করা আমার কর্তব্য বলে মনে করছি।  সর্বোপরি, আপনি আমার বন্ধুর প্রাণ বাঁচিয়েছেন, সেই কৃতজ্ঞতা টুকুও জানানো দরকার। চমনলাল আমার বাল্যবন্ধু। এমন সৎ আর আদর্শবান মানুষ কমই হয়। আমি মহারাজা, কিন্তু কোনদিন ও আমার কাছে কিছু চায়নি। নিজের ভাগ্য গড়তে চলে গিয়েছিল সুদূর আফ্রিকায়। সাক্ষাতে আরও কথা হবে। যদি অনুরোধ রক্ষা করা সম্ভব হয় তাহলে খুবই আনন্দিত হব। চিঠির উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম। 
ধন্যবাদান্তে, 
মহারাজা বীরেন্দ্র প্রতাপ সিংহ
রয়াল গভর্মেন্ট অব কুঞ্জবিহার।

চিঠিটা পাওয়ার পর চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল রাকিব।  আব্বুর শরীর খুব একটা ভাল যাচ্ছিল না।  কিন্তু সব শুনে আব্বুই বলেছিল– “দূর পাগল, বয়স হলে শরীর একটু আধটু খারাপ হয়েই থাকে। তাছাড়া তুই তো এবার চাকরি নিয়ে বহু দূরে যাচ্ছিস না। একজন মহারাজা তোকে সন্মান জানাতে চাইছে, এ তো বিরাট ব্যাপার। এদিকে রায়হান, রিয়াজ ওরা তো আছেই।” 

আম্মুও বাধা দেননি। ঈশ্বরের দোয়ায় ওদের সেই অনটন আর নেই। বড়দাদা রায়হান একটা চাকরি পেয়েছে ইংরেজদের অফিসে। ইতিমধ্যে আব্বাকে একবার শহরের বড় ডাক্তার দেখিয়েও এনেছিল রাকিব। তাঁর আস্বাস পাওয়ার পর মনের শংকাটাও দূর হয়ে গিয়েছিল। 

রাকিব কুঞ্জবিহারে পা রাখতেই রাজকীয় অভ্যর্থনা জানিয়ে ছিলেন মহারাজা বীরেন্দ্র প্রতাপ। পূর্ব বাংলার অজানা পাড়া গাঁয়ের ছেলে রাকিব স্বপ্নেও কোনদিন এমনটা ভাবতে পারেননি। মহারাজার প্রতি কৃতজ্ঞতায় চোখে জল চলে এসেছিল। 

কটা দিন দারুণ বিলাসের জীবন কাটল। মহারাজা বীরেন্দ্র প্রতাপ সিংহের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছিল রাকিব। একজন স্বাধীন দেশীয় রাজ্যের মহারাজা, অথচ তাঁর কী বিনম্র ব্যবহার!  

কুঞ্জবিহার। ভারতের মানচিত্রে ছোট একটা কালো বিন্দু যেন। এখানে আসার আগে ভাল করে খোঁজ খবর নিয়েছিল রাকিব। বৃটিশ সরকার ইচ্ছে করলেই গ্রাস করতে পারত এই ছোট্ট রাজ্য টিকে। কিন্তু করেনি। তার একটি গূঢ় কারণ বোধহয় রাজ্যটির ভৌগোলিক অবস্থান। ছবির মতো সুন্দর এই রাজ্য বৃটিশরা ব্যবহার করে আসছে তাদের ঢাল হিসেবে। তাই মিত্র রাজ্য হিসাবেই তাদের পছন্দ এই কুঞ্জবিহার কে। 

কিন্তু বীরেন্দ্র প্রতাপ যে ইংরেজদের আচরণে সন্তুষ্ট নন সেটা এখানে এসেই বুঝতে পেরেছিল রাকিব। ধূর্ত বৃটিশরা কী সেটা বোঝে না? বীরেন্দ্র প্রতাপ এর কথায় সেটাও একদিন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তিনি স্পষ্ট কথা বলতে ভালবাসেন। সরাসরি বলেছিলেন– “ইংরেজরা চায় না আমি মহারাজা থাকি। তাই ওরা গোপনে আমার ভাই জীতেন্দ্র প্রতাপ কে ফোসলাচ্ছে। আরও অনেক চক্রান্ত করছে। আমি যেকোন দিন খুন হয়ে যেতে পারি রাকিব। একটা গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস আমি পাই, কিন্তু সবটা বুঝে উঠতে পারি না। আপনাকে কেন যেন কাছের মানুষ মনে হয়েছে, তাই বলে ফেললাম কথাটা।” 

রাকিব জিজ্ঞেস করেছিল– “আপনার এমন মনে হওয়ার কারণ?”

মৃদু হেসে ছিলেন মহারাজা- “কারণ অনেক গভীরে। আশেপাশের রাজ্য গুলির সাথে আমি বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলতে চাই। বৃটিশদের সেটা না–পসন্দ। ওরা যখন তখন একটা নীতি বানিয়ে আমাকে চাপ সৃষ্টি করে সেসব মেনে চলতে।  আরও অনেক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে, সেসব আপনি ঠিক বুঝবেন না।”

কথাটা একদম সত্যি। রাজনীতির কূটকাচালি রাকিবের মাথায় একদম ঢোকে না। তার জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা।  ছাপোষা বাঙালি ঘরের অতি সামান্য এক যুবক সে, এসব রাজরাজরাদের ব্যাপার স্যাপার তার ক্ষুদ্র মাথা নেবে কেমন করে! কিন্তু বীরেন্দ্র প্রতাপ সিংহের যন্ত্রনা টুকু তার হৃদয়ের কোথায় যেন আঘাত করে গেল।  

মহারাজা বীরেন্দ্র প্রতাপ’রা চার ভাই। তিনিই সবার বড়। উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসনে বসেছেন।  প্রজাবৎসল ও দয়ালু রাজা বলে রাজ্যে তার যথেষ্ট সুনামও রয়েছে। মেজভাই ধীরেন্দ্র প্রতাপ ছিলেন অসাধারণ স্পোর্টস ম্যান।  সব খেলাতে সমান পারদর্শী।  ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস, ব্যাডমিন্টন, সুইমিং– সবেতেই সমান ওস্তাদ।  বেশ কয়েকবার বিলেতে গিয়েও খেলে এসেছেন, পুরস্কারও পেয়েছেন অনেক।  তিন বছর আগে হঠাৎ করে তার মৃত্যু হয়। দীপঝিলের পারে তার নিথর দেহ পাওয়া যায়। দীপঝিলের জলে মাঝে মাঝে তিনি সাঁতার কাটতে নামতেন। সেদিনও নেমেছিলেন। ডাক্তারি মতে, জলের মধ্যেই তার হার্ট অ্যাটাক হয়। কোন রকমে পারে পৌঁছুলেও শেষ রক্ষা হয়নি। তার প্রাণ চলে যায়। কিন্তু তার মৃত্যু বেশ কিছু প্রশ্ন রেখে যায়। ধীরেন্দ্র প্রতাপ সবসময় মাঝ বরাবর সাঁতার কাটতেন। সেক্ষেত্রে বাঁচার জন্যে তার ঘাটের দিকে আসাটাই স্বাভাবিক ছিল। অথচ তার লাশ পাওয়া যায় দীপঝিলের পশ্চিম ধারে, হালকা ঝোপঝাড়ের মধ্যে। এটা কেমন করে সম্ভব হয়েছিল? সে রহস্য অনেকের মনেই দাগ কেটেছিল। কিন্তু সে রহস্যের কোন কিনাড়া হয়নি। চলবে…

সুজিত বসাক । দিনহাটা, কুচবিহার