অটোয়া, বুধবার ৮ এপ্রিল, ২০২০
জুরিখ থেকে জেনেভার পথে – চিরঞ্জীব সরকার

০১৮ এর মে মাসে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে আসেম সিনিয়র অফিসিয়াল রিট্রিটে ওদেশে যাই। প্রায় পঁচাশি  লক্ষের জনসংখ্যার এ দেশটি নানা কারনে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে চলেছে। যেমন বিশ্বের ধনকুবেরদের টাকা সুইস ব্যাংক খুব যত্নের সাথে রাখে। কোনরকম তথ্য নাকি তাঁরা প্রকাশ করে না। আমার কেন জানি মনে হয় সুইস ব্যাংকে অর্থ যে জমা রাখে তাঁর আদৌ সেটা কোন কাজে লাগে না কারন সে তো নিশ্চয়ই এ অ্যাকাউন্টের চেক কেটে কোন মার্কেটিং করে না। তাঁর ডেইলি লাইফ ম্যান্টেনেইন্সের জন্য যে ক্যাপিটাল দরকার তা তো তাঁর এমনিতেই আছে। এটা হয়ত তাঁর বৃথা সময় ও শ্রমের অপচয় এবং মাঝখানে কত মানুষের ন্যায্য পাওনার অবৈধ ও অনৈতিক চর্চাও কারন এ জমানো অর্থ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কালো টাকা। লিও টলস্টয়ের একটি বিখ্যাত গল্প “হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ এ ম্যান নিড” এ গল্পটি যদি তাঁরা একটু গভীরভাবে  অনুধাবন করত তাহলে হয়ত তাঁরা এ ক্রেজি ট্রেন্ড থেকে সরে আসত। এ গল্পে একটা লোভী লোক এমন একটা অফার পায় যেখানে বলা হয়েছে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সে যতটুকু জায়গা পরিভ্রমন করে আসতে পারবে সে পরিমান জমির মালিক সে হবে তবে শর্ত থাকে যে তাঁকে সূর্যাস্তের আগে অবশ্যই সে যেখান থেকে তার যাত্রা শুরু করবে সেখানে ফিরে আসতে হবে। লোভী ব্যাক্তিটি সমস্ত শক্তি দিয়ে জমি লাভের জন্য সূর্যোদয়ের সময় দূরন্ত গতিতে পরিভ্রমন শুরু করে  ক্রমাগত দৌড়াচ্ছিল এবং মনে মনে ভাবছিল আমি যত বেশি জায়গা অতিক্রম করতে করতে পারবো ততটাই তো আমার হবে। দুপুর গড়িয়ে যায় আর সে শুধু সামনে দৌড়াচ্ছে তো দৌড়াচ্ছে। যখন তাঁর হুশ হল যে তাঁকে তো যাত্রা শুরুর জায়গায় ফিরে যেতে হবে ততক্ষনে বেলা অনেক গড়িয়ে গেল। সে পিছনের দিকে প্রানপনে ছোটার চেষ্টা করল। কিন্তু সারাদিন দৌড়ানোর কারনে তাঁর পাদুখানি ক্লান্তিতে আর চলতে পারছিল না। অবশেষে সে যখন সূর্যাস্তের সময় তাঁর যাত্রা শুরুর স্থানে পৌঁছল তখন তাঁর ক্লান্তিতে ভরা অবসন্ন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ও শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল। তাঁর মৃতদেহটির জন্য অন্তিমে কেবল ছফুট জায়গা লেগেছিল।

সুইজারল্যান্ড একটি স্ম্যার্ট দেশ। পৃথিবীর অন্যতম সুখী মানুষের দেশ এটি। আল্পসের পাদদেশের চারনক্ষেত্রে যখন সুইস স্বাস্থ্যবান গরুগুলি একমনে ঘাস ক্ষেতে থাকে তখন পাশের চলন্ত ট্রেন থেকে এ দৃশ্য দেখলে আলেকজ্যান্ডার পোপের মতই মনে হবে সুইসরা প্রকৃতপক্ষে সুখী। পোপ তার বিখ্যাত  “Ode on Solitude” কবিতায় লিখেছিলেন সুখী সে ব্যাক্তি যে তার সীমিত একখন্ড জমিতে নিজের খাদ্য নিজেই উৎপাদন করে, নিজের পালিত গরুর দুগ্ধে তৃপ্তি ও পুষ্টি মিটায়, নিজের পোশাক নিজের পালিত ভেড়ার পশম থেকে বানায়, নিজের লাগানো বৃক্ষ যাকে আদরের ছায়া প্রদান করে, চিন্তাহীন যার সুখনিদ্রা এবং যে পৃথিবী থেকে সকলের অগোচরে বিদায় নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে সমাধিপ্রস্তরহীন সোদা নরম মাটির এক নিভৃত কোলে। সুইজ্যারল্যান্ড প্রকৃতি এবং পরিবেশে এরকম কাব্যিক আবহের যথেষ্ট রসদ রয়েছে। 

বার্ন সুইজারল্যান্ডের রাজধানী হলেও দেশটির সবচেয়ে বড় শহর জুরিখ। চকোলেটের দেশ সুইজারল্যান্ড। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী চকোলেট উৎপাদন হয় এখানে। একি সাথে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় সুইসরা বেশি চকোলেট খায়ও বটে। একচল্লিশ হাজার বর্গকিলোমিটারের একটু বেশি আয়তনের সুইজারল্যান্ডে ছোট বড় মিলিয়ে রয়েছে পঁনেরশ-এর অধিক লেক। এ দেশের প্রতি দশমাইলের ভিতর কোন না কোন লেকের দেখা মেলবেই। এর ভিতর লেক জেনেভা, লেক কনস্ট্যানস, লাগো ম্যাগিওরে ও লেক জুরিখ উল্লেখযোগ্য। এ বার্নেই যখন পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন থাকতেন তখন তিনি তাঁর বিখ্যাত “থিওরি অব রিলেটিভিটি” নিয়ে কাজ করেন। সুইস ব্যবসায়ী এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ডুরান্ট ১৯০১ সনে পৃথিবীর সর্বপ্রথম নোবেল পুরস্কারটি পান। পৃথিবীর অন্যতম দামী ঘড়িগুলি যেমন রোলেক্স সুইজারল্যান্ডে উৎপাদিত হয়। পারমানবিক যুদ্ধ হলে সারা দেশের জনগন যাতে ভূগর্ভস্থ সেল্টারে আশ্রয় নিতে পারে তার ব্যাবস্থাও তাঁরা করে রেখেছে। প্রতি একশজন সুইস নাগরিকের ভিতর গড়ে পয়তাল্লিশটি বন্দুক থাকলেও অপরাধের মাত্রা এদেশে একেবারেই নগন্য। রাজনৈতিকভাবেও দেশটা এমন একটা অবস্থান নিয়ে চলে যাতে সবাই দেশটিকে মোটামুটি পছন্দ ও বন্ধুভাবাপন্ন মনে করে।

অ্যামিরেটসের ফ্লাইটে যখন জুরিখ অবতরন করলাম তখন বেলা সন্ধ্যায় গড়িয়ে গেছে। আকাশ থেকে জুরিখকে দেখলেই মোটামুটি বুঝা যায় দেশটিকে তাঁরা ফুলের বাগানের মত পরিচর্যা করে রেখেছে। এয়ারপোর্ট থেকে শাটল বাস নামিয়ে দিল হোটেলের কাছাকাছি একটা জায়গায় কয়েক সুইস ফ্রান্কের  বিনিময়ে। এক ইয়াং ছেলে গাড়িটির ড্রাইভার। আর আমরা সাকুল্যে পাঁচজন যাত্রী। এক একজন প্যাসেঞ্জার নামছে এবং সেও পিছন থেকে তাঁর লাগেজ বের করে হাসিমুখে বুঝিয়ে দিয়ে হ্যান্ডসেক করে আবার গাড়িতে উঠে রওহনা হচ্ছে পরবর্তী গন্তব্যে। সর্বশেষ যাত্রী আমি। আমাকেও ড্রপ করল যে হোটেলটায় থাকব তার নিকটেই। হোটেলটির জানালা দিয়ে দেখছি সামনের রাস্তায় মাঝে মাঝে কিছু গাড়ি চলাচল করছে। ট্রেনও যাচ্ছে কিছুক্ষন পর পর কিন্তু রাস্তায় কোন মানুষের দেখা পেলাম না। পঁচাশি লাখ মানুষের দেশে সর্বত্র মানুষের দেখা না পাওয়াই তো স্বাভাবিক।

বার্নের অফিসিয়াল কাজ শেষ করে আলজেরিয়ান এক ড্রাইভারের সাথে জুরিখ শহরটা ঘুরলাম অনেক সময় ধরে। সারা জুরিখ শহরে অসংখ্য ফাউন্টেন। এগুলি নাকি জনগনের তৃষ্ণা নিবারনের জন্য তৈরী করে রাখা হয়েছে। অনেক পুরানো বাড়ি ও চার্চ দেখলাম। এখানকার সেন্ট পিটার চার্চের ঘড়ি ইউরোপের ভিতর বৃহত্তম। অনেক লোক সাইক্লিং করছে।জেনেভার ট্রেন  ধরার জন্য যখন জুরিখ রেল স্টেশনের দিকে যাচ্ছি তখন ড্রাইভারটি বলল “আমি কি আমার বাচ্চাকে গাড়িতে তুলে আমার বাসায় রেখে আসতে পারি। জুরিখ ট্রেন স্টেশনের পথেই আমার বাসা। এখানে ঘড়ির কাঁটা ধরে সবকিছু চলে। তোমার হাতে সময় থাকলে কোন অসুবিধা হবে না। “আমি দেখলাম আমার হাতে যথেষ্ট সময় আছে। তাই বললাম ঠিক আছে, তুমি তোমার সন্তানকে তোল,  আমার হাতে সময় আছে।” একটা স্কুলের সামনে থেকে তার মেয়েকে তুলে বাসার কাছে গাড়ি থামিয়ে ঘরে চলে গেল। সে যখন বাসায় চলে গেল আমি গাড়িতে বসে ভাবতে ছিলাম আলজেরিয়ান ওই ড্রাইভারের কথা। ভাগ্য হয়ত তাঁকে আজ ইউরোপের জুরিখে এনে ফেলেছে। কিন্তু এ ইউরোপে আসতে গিয়ে কতজনের ভাগ্যে ঘটে সলিল সমাধি। আমি জুন্মন নামে নারায়নগঞ্জের একটা ছেলেকে চিনি যার আফ্রিকা থেকে স্পেনে পৌঁছার সে কষ্টসাধ্য জার্নি নিয়ে ছোটখাট একটা উপন্যাস লেখা যাবে।

জুরিখ থেকে যখন জেনেভার দিকে যাচ্ছি তখন সাজানো সুইজারল্যান্ডকে দেখছি। একটা সময় খেয়াল করলাম লেকের পার ঘেষেই ট্রেন যাচ্ছে। লেকের ট্রেইল ধরে অনেক টুরিস্ট লজ। এগুলোর সাথে রয়েছে প্রচুর বোট। কেউ কেউ লেকে মৎস্য শিকারে ব্যস্ত।ধৈর্য যাদের নেই তাঁরা মনে হয়  বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে পারবে না। মাছ কখন এসে বড়শিতে ধরা পড়বে এটাতো হাইজেনবার্গের প্রিন্সিপেল অব আনসার্টেনিটির মত এক ধরনের অবস্থা। মাছ একমিনিটের ভিতর খোঁট দিতে পারে আবার সারাদিনেও না দিতে পারে। এরকম একটা অবস্থা সহ্য করার ক্ষমতা যার আছে সেই প্রকৃতপক্ষে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে পারবে। আমাদের বাড়ি থেকে বরিশাল শহরে যাওয়ার পথে মাধবপাশা নামক একটি জায়গায় দূর্গাসাগর নামে একটি দিঘী আছে। এ দিঘীটির ভিতর গাছপালায় পরিপূর্ন একটি ছোট দ্বীপের মত জায়গা আছে। দিঘীটির পাশ দিয়ে যখন  বরিশালের দিকে যেতাম তখনি দেখতে পেতাম অনেক সৌখিন মৎস্যশিকারীদের যারা হুইল নিয়ে টোলঘরের মত বানানো মাঁচায় কি ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করছে। আর আমার পক্ষে সর্বমোট পঁনের মিনিটের বেশি বড়শি নিয়ে বসে থাকা সম্ভবপর নহে।এটা আমি বহুবার চেষ্টা করে দেখেছি।

জেনেভা রেল স্টেশনে এককালের সহকর্মী ও বর্তমানে ডাব্লিটিওতে (ওয়ার্লড ট্রেড অর্গানাইজেশন) কর্মরত বন্ধু তৌফিক আমাকে রিসিভ করল ঘড়ির কাঁটা ধরে। ওখান থেকে ওর বাসায় নেয়ার আগে জেনেভা লেকের কাছে নিয়ে গেল। আমরা দুজনে দুটি কফির কাপ নিয়ে লেকের পাশে একটা পাথরের উপর বসে পুরানো দিনের বিশেষ করে সাভারের বিপিএটিসির সে সুখময় স্মৃতিগুলি রোমন্থন করছিলাম। এরপর বয়ে গেছে বিশটি বছর জীবনের পরমায়ু থেকে। লেক জেনেভাও আর বিশ বছরের পুরনো জলধারা বুকে ধারন করছে না নিশ্চয়ই।

চিরঞ্জীব সরকার । অটোয়া, কানাডা