অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
ফড়িং-ধরা বিকেল (পঞ্চম অংশ) – নূরুন্‌ নাহার

ফড়িং-ধরা বিকেল চতুর্থ অংশ পড়তে ক্লিক করুন


পঞ্চম অংশ  

আচার-খাওয়া দুপুর

[ উৎসর্গঃ ধ্রুব এষ, আসমা সুলতানা ও ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান—যাঁদের প্রত্যয় ও প্রতিশ্রুতি প্রেরণা যোগায় ]

আর একদিনের কথা।
স্মৃতির সুতোয় টান পড়তে শুরু করেছে।
স্মৃতিরা যেন সশব্দে কথা কয়ে উঠছে।
মায়ের ছিল অনেক গুণের বাহার।
আচার বানানো গুণটাও তাঁর গুণের সংখ্যার মাঝে একটি।
মুখরোচক, খুব মজার মজার আচার বানাতো মা।
সব সময় আমাদের ঘরে আচার থাকতো।
একদিন মা বললো, পুরোনো আচারগুলো খেয়ে ফেলিস।
তখন দুপুর। দুপুরের খাওয়া সেরে সবাই ঘুমোচ্ছে।
সেই ফাঁকে আচারের বয়ামগুলো নিয়ে কলোনির সাথিদের ডেকে, একসাথে সব আচারগুলো খেয়ে শেষ করে ফেলেছিলাম।
মা ঘুম থেকে উঠে দেখে আচারের বয়ামগুলো সব খালি। মা অবাক চোখে মাথায় হাত তুলে বলেছিলো, আচার কী হল? আমরা বলেছিলাম, তুমি না বলেছিলে, পুরোনো আচারগুলো সব খেয়ে শেষ করে ফেলতে। তাই সব আচার খেয়ে শেষ করে ফেলেছি। মা বলেছিলো, আমি কি অমন করে একদিনে সব আচার খেয়ে শেষ করে ফেলতে বলেছি? 

মা মনের সব ঝাল মিটিয়ে মেরেছিল সেদিন। কেঁদেছিলামও সেদিন সারাদিন। চোখের জল যেন বাঁধ মানছিল না। বাবার সেই ছোটো বোন আমাদের কান্নার সাথে ছিল এবং মমতায় চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছিল। সেদিন মায়ের হাতে মার খেয়ে কষ্টের নদীতে ভেসেছিলাম। কিন্তু কী সুখে যে আজ মনে পড়ছে মায়ের হাতে মার-খাওয়া সেই আচার-খাওয়া দুপুর।
কষ্টগুলো আজ যেন সব সুখের নদী।
আহা! সুখের নদীতে ঘুরে ঘুরে—
সেই আচার-খাওয়া দুপুরে—
আবার ফিরে যেতে পারতাম যদি!!!

রজনীগন্ধার সঙ্গে প্রথম পরিচয়

[ উৎসর্গঃ তৃপ্তি মিত্র, গৌরী ঘোষ ও ফেরদৌসী মজুমদার—যাঁদের শৈল্পিক কারুকাজে জীবনের স্পন্দন খুঁজে পাই ]

বেনাপোলের সেই পুকুরপাড়ে একদিন খেলতে খেলতে ঘাসের ভেতর আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম পেঁয়াজ পাতার মত একটা গাছ। পুকুরপাড় থেকে গাছটা তুলে এনে খুব যত্ন করে বাসার উঠোনের এককোণে লাগিয়ে রোজ পানি দিতাম। দিন যেতে যেতে কিছুদিন পর দেখলাম ঝাড় ধরা গাছ ফুঁড়ে সুগন্ধ-ভরা তন্বী তনুলতার মতো শুভ্র-বসনায় একটা লম্বা ডাঁটার মাথায় একগুচ্ছ আধো ফোটা ফুলের কলি বেরিয়েছে।
গন্ধে বাসা ভরে গেছে। পরে আবিষ্কৃত হলো এই ফুলের নাম রজনীগন্ধা।
কী কাব্যিক নাম।
শুনেই সুগন্ধে মন ভরে গিয়েছিল।

সেই বুঝি প্রথম রজনীগন্ধার সঙ্গে দেখা।
এখনো রজনীগন্ধা দেখি।
কিন্তু প্রথম দেখা ‘রজনীগন্ধাকে’ যেন আর খুঁজে পাইনে।
অমন করে আর দেখাও হয়নি কোনোদিন।
এ যেন সুগন্ধি-স্মৃতি।
আর বুকের ভেতর যেন বয়ে যাচ্ছে মধুর মায়া-গীতি।


ছোছরা পাতা

[ উৎসর্গঃ কথা, সুর ও গানের পাখি কানন দেবী, ফিরোজা বেগম ও ফরিদা পারভীন-কে ]

খুব তিক্ততার স্মৃতি খুব মধুর করে মনে পড়ছে। ছোছরা পাতা নামে একটা পাতা আছে বনে। ভালো বাংলায় হয়তো বা বিছুটি পাতা বলে। সেই বেনাপোলের খেলার সাথিদের সঙ্গে যদি কোনো মতবিরোধ অথবা ঝগড়া হতো, তাহলে সেই ছোছরা পাতা গায়ে ঘষে দিয়ে শাস্তি দিতাম আমরা একে অন্যকে। সেই পাতা গায়ে লাগলে সারা গা চুলকিয়ে ফুলে যেত এবং ভীষণ জ্বালাপোড়া করতো। যন্ত্রণাও হতো সারা শরীরে। এমন সহজ উপায়ের শাস্তি বুঝি আর দ্বিতীয়টি নেই। এ যেন ছিল আমাদের শাস্তি-শাস্তি খেলা। এ খেলাও খুব সুখে আমরা বহুদিন খেলেছি বেলা-অবেলায়।


ভাঙা-চুড়ি

[ উৎসর্গঃ আবৃত্তি ও নাট্য-শিল্পী হুমায়ুন ফরিদী, সুবর্ণা মুস্তাফা ও প্রজ্ঞা লাবণী-কে ]

বেনাপোল কলোনির ড্রেনের ধারে সব বাসা থেকে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হতো। তার ভেতরে থাকতো অনেক কিছু। সেই অনেক কিছুর ভেতরে থাকতো রঙ-বেরঙের ভাঙা কাচের চুড়ি।
ময়লা-আবর্জনা ঘেঁটে আমরা সেই রঙ-বেরঙের ভাঙা-চুড়ি সংগ্রহ করতাম। তারপর সেগুলো ধুয়ে-মুছে স্বচ্ছ কাচের বোতলে ভরে সাজিয়ে রাখতাম বসার ঘরে। কী যে চমক ছিল সেই কাচের ভাঙা-চুড়ি সংগ্রহের ভেতরে! কাচের বোতলে ভাঙা-চুড়িগুলো যেন শো-পিসের যুগে হয়তো তা একেবারেই ফিকে। কিন্তু আমার কাছে আজও সেই তুচ্ছ ভাঙা-কাচের চুড়ির দাম যেন মণি-মুক্তোর মতো। তাইতো আজও স্মৃতির ঘাটে বসে তাকিয়ে আছি সেই ফিরে দেখা মণি-মুক্তোর দিকে!


রেডিও শোনা

[ উৎসর্গঃ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও হুমায়ুন আজাদ-কে ]

বেনাপোলে আমাদের জীবনযাপন ছিল খুব হিসেবের। যেন ঠিক নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মতো। কারণ আগেই বলেছি, বাবা ছিলেন একজন সৎ কাস্টম-অফিসার।
উপরি কোনো পয়সা ছিল না। বিনোদনের জন্য আমাদের ঘরে কিছুই ছিল না। খুব ইচ্ছে করতো রেডিওর গান শুনতে। মনে হতো, একটা যদি রেডিও থাকতো আমাদের কী ভালোই না হতো। সাধ মিটিয়ে গান শুনতে পারতাম। কিন্তু তখন রেডিও কেনার মতো স্বচ্ছল অবস্থা আমাদের ছিল না। পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য খাবার, লজ্জা নিবারণ করার জন্য কাপড় — এসবই রেডিও থেকে বেশি জরুরি ছিল। যখন দু’মুঠো খাবার পেটে থাকতো, তখনই রেডিওর গান শোনার কথা মনে হতো। ইচ্ছেটা যখন খুব তীব্র হতো, তখন পা টিপে-টিপে চুরি করে পাশের বাসার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে গান শুনতাম কান ভরে। কী যে ভালো লাগতো সেই লুকিয়ে গান-শোনা। মাঝে-মাঝে এদিক-ওদিক আড়-চোখে তাকিয়ে দেখতাম কেউ দেখে ফেলে কি না। লজ্জাও লাগতো এভাবে কারো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে গান শুনতে। কিন্তু উপায় তো ছিল না কিছু। ছুটে যেতেই হতো ওভাবে চুপি-চুপি, গানের টানে। আজ চারদিকে কত মিডিয়া আর সারাবেলা ভরে থাকে কত যে সুরে-সুরে, গানে-গানে তা তো সবাই জানে। তবু মন ফিরে যায় সেদিনের সেই চুপি-চুপি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে শোনা গানে!... … …. চলবে

ঢাকা, বাংলাদেশ 

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন

ছড়া ও কবিতাঃ বর্ষা যখন – নূরুন্‌ নাহার