অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
ফেলে আসা দিনগুলি (২য় পর্ব) – হুমায়ুন কবির

ফেলে আসা দিনগুলি ১ম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন
দুই 
লিজাবেধ ডি কস্টা মেমের কথা  চয়নের খুব মনে পরছে। মনে পরছে বহ্নির কথাও। আর ফরিদপুর ব্যাপিস্ট চারজের মিশন স্কুলকে। সেদিন মেম ক্লাসে ঢুকতেই একটা মিস্টি সৌরভ ছড়িয়ে গেলো সমস্ত শ্রেনী কক্ষে। মেমের ভুবন ভূলানো হাসি, প্রশান্তিতে ভরে গেলো মন-প্রান সব কিছু। মনে হচ্ছে আনন্দ ধারা ছড়িয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে। মেম বলল,
-শুভ সকাল। তোমরা ভালো আছো সবাই?
চয়ন উঠে দাড়ালো। সবাই উঠে দাড়ালো।  
-শুভ সকাল মেম। জ্বী, ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?
-হ্যাঁ, ভালো আছি।
মেম বেঞ্চের একেবারে শেষের দিকে তাকালো অসম্ভব সুন্দর ফুট ফুটে একটি মেয়ে।  একেবারে সবার শেষ বেঞ্চিতে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। মেমের খুব মায়া হলো। মেম মেয়েটির কাছে এসে দাড়ালো। মেম জানতে চাইলো,
-তোমার নাম?
-বহ্নি।
-এতো পিছনে বসে আছো যে? 
বহ্নি কোন উত্তর না দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে এলিজাভেদ মেমের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেম গভির মমতায় বহ্নির মাথায় হাত রাখলো। মেম লক্ষ্য করলো, বহ্নির চোখ ভিজে গেছে। চোখে পানি। মেম শাড়ি পরা ছিলো। আঁচল দিয়ে বহ্নির চোখ মুছে দিলো। বুকে জড়িয়ে ধরলো। সবাই কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে রইলো। মেম নিজে বহ্নির ব্যাগ নিলো। বহ্নিকে হাত ধরে এনে প্রথম বেঞ্চিতে চয়নের পাশে বসতে দিলো। বহ্নি বলল,
-থ্যাঙ্ক ইউ মেম।
-থ্যাঙ্ক ইউ বহ্নি।
শ্রেনী কক্ষের কেউ কেউ হসছিলো। মেম সবাইকে চুপ থাকতে বললেন। মেম বলতে শুরু করলেন।
-আমি তোমাদের নতুন শিক্ষিকা। আমি তোমাদের সামাজিক বিজ্ঞান পড়াবো। তবে আজকে আমি তোমাদের পড়াবো না। তোমাদের সংগে গল্প করবো।
এলিজাবেধ মেম অনেক ভালো ভালো কথা বললেন। বহ্নি কিছুটা বুদ্ধি প্রতিবন্দি ছিলেন। যে কারনে চয়ন ছাড়া সব ছেলে মেয়েরাই বহ্নিকে কিছুটা এড়িয়ে চলতো। আর বহ্নিও নিজেকে একটু আলাদা করে রাখতো। এলিজাবেধ মেমের সহযোগীতায় সবাই বহ্নির পাশে এসে দাড়ালো। সহযোগীতা  করতে থাকলো আন্তরিকভাবে। বহ্নিও নিজেকে সবার সংগে মিশিয়ে দিলো। একে ওপরকে সহযোগীতার মাধ্যমে বহ্নি সত্যিকারের আলোক রস্নি হয়ে গেলো। হয়ে গেলো বহ্নি শিখা। ভালো বাসা আর সহযোগীতাও অনেক বড় কিছু। নতুন মেমের আন্তরিক সহযোগীতায় একটা বুদ্ধি প্রতিবন্দি শিশুকেও অনেকের চেয়েও অনেক বেশি বুদ্ধিদিপ্ত করে তুলতে পারে। বহ্নিই সেটা প্রমান করলো।
এখনো চোখ বন্ধ করলেই মনে পরে যায়  চিত্ত, জোসেফ, ফ্রান্সিস রোজারিও আর বহ্নিকে। চয়ন খুব কাছ থেকে দেখতে পায় সব্বাইকে। দূর থেকে ওরা হাতছানি দিয়ে ডাকছে। শুনতে পায় এলিজাবেদ ডি কস্টা মেমের কথা,
-তোমরা ভালো আছো সবাই? 
*****
সকাল বেলাই রানু এসে হাজির। চয়নকে বলল,
-আজকে আমাদের বাড়িতে বাঁশ নাচানি এসেছে। তুমি দেখতে যাবা?
-বাঁশ নাচানি! সে আবার কি? চয়ন কিছুই বুঝলোনা। এর আগে এমন শব্দও সে শুনেনি। তবে খুব অবাক হলো। কৌতুহলও হলো। নতুন কিছুর প্রতি চয়নের বরাবরই আগ্রহ একটু বেশি। রানুর সঙ্গে আজকে লালুও এসেছে। লালু তাদেরই বয়সী।  চয়ন বলল,
-যাবো, চল যাই। 
রানু, লালু আর চয়ন চলল বাঁশ নাচানি দেখতে চলল।
চয়নদের বাড়ির পাশের বাড়িই রানুদের বাড়ি। রানুদের বাড়ির নাম ফকির বাড়ি। কোন এক কালে রানুদের পূর্ব পুরুষদের কেউ একজন ঝার ফুঁক দিয়ে চিকিৎসা করাতেন। সেই থেকে এই বাড়ির এমন নাম। রানুদের বাড়ির ঊঠানটা বেশ বড়। বাঁশ নাচানীদের দলে দশ থেকে বারো জন পুরুষ আছেন। সবাই-ই গেরুয়া রঙের পোশাক পরেছেন। পোশাক বলতে লুঙ্গি আর এক টুকরা কাপড় গলায় পেচানো। মাথায়ও পাগড়ি পরেছেন। সবার কাধেই একটি করে বাশ। বাশটিও বাহারি রঙে সাজানো। বাঁশের মাথায় জরির ঝালর ঝুলানো আছে। বাঁশের মাথা থেকে শেষ পর্যন্ত  একটা রঙিন দড়ি বাধা। কাঁধে বাঁশ রেখে এক হাত দিয়ে ধরে রেখেছে। অন্য হাতে দড়ি। এতে বাঁশের ভারসাম্য বজায় থাকছে। সবাই গোল হয়ে চারদিক দিয়ে নাচছে। আর গান গাইছে। মাঝখানে পানি ঢেলে দেয়া হয়েছে। একজন ঢুলি ঢোল বাজাচ্ছে। আর একজন অন্য একটা দেশীয় বাদ্য বাজাচ্ছে। কি সুরেলা সেই বাদ্যের শব্দ! কাছে না এলে তা বলে বুঝানো যাবেনা। বাজনার তালে তালে বাঁশ নাচানীর দল নাচছে আর গাইছে। কি যে ভালো লাগছে! সবটাই চয়নের কাছে নতুন হলেও ভিশন ভিশন আনন্দ হচ্ছে। ভালো লাগছে। গাঁয়ে এতো আনন্দ আছে!  পাখির কলতান, সবুজ গাছ-পালার বিশাল সমারোহ। জ্যোৎস্না মাখা রাত। ঝকে ঝকে রোদেলা সকাল- দুপুর। সবকিছুতেই হৃদয়-মন জুড়িয়ে যায়। পাগলা হাওয়া আর বৃষ্টির ঝিরি ঝির মিস্টি পানির মোলায়েম পরশে কচি কোমল প্রাণ নেচে নেচে যায়। 

মিনিও কাছাকাছি ছিলো। রানু ডাকলো,
-এই বগার বউ এই দিকে আয়। দেখ চয়ন এসেছে। মিনি বলল,
-আসছি। পপের মা তুই এতোক্ষন কোথায় ছিলি? তোকে কতো খুজেছি।
-চয়নকে ডাকতে গিয়েছিলাম। 
-ও আচ্ছ। খুব ভালো করেছিস। কিরে লালু তুই এতোদিন পর এলি?
লালু বলল,
-এতোদিন কোথায়, তোর পুতুল বিয়েতেওতো আসলাম।
-সে-তো অনেকদিন হয়ে গেছে। একদিন বাড়ালি তলা যাবি? চয়ন জানতে চাইলো,
-বাড়ালি তলা আবার কি?
লালু বলল,
-একটা হিজল গাছ। অনেক বড় ও অনেকটা জায়গা জুড়ে এর অবস্থান। একটা করে ডাল মাটির সংগে মিশে আবার নতুন গাছ হয়েছে। এভাবে অনেকটা জায়গা জুড়ে অনেক বড় ও সুন্দর একটি গাছ। খুব সুন্দর দেখতে। এই গাছ কেউই কাটতে পারেনা। কেউ একজন কাটার চেস্টা করেছিলো কিন্ত পারেনি। এর কান্ড থেকে রক্ত ঝরছিলো। সেই থেকে কেউ এর একটা পাতাও ছিড়তে সাহস করেনা। আর বর্ষাকালে যখন চারদিক পানিতে থৈ থৈ করে। পথ-ঘাট সব ডুবে যায়, তখনও বারালি তলার এই হিজল গাছ ভেসে থাকে। অনেকে এখানে মানত করতে আসে। কেউ কেউ দেখতেও আসে। একবার একটা ছিনেমার শ্যুটিং হয়েছিলো। দোলানা বেঁধে দু'জন মেয়ে দোল খেয়েছে ও গান করেছে। কি সুন্দর সেই  দৃশ্য! চয়ন বড় হয়ে সেই ছিনেমাটা দেখেছে। বারালি তলার গল্প শুনে চয়নের ভারি আনন্দ হলো। তার কেবলি মনে হলো, আহা! একবার যদি আমি সেই বারালি তলার হিজল গাছটি দেখতে পেতাম! কি যে আনন্দ হতো! বড় হওয়ার পর চয়ন যখন ইভানকে সঙ্গে নিয়ে বারালি তলার গাছটি দেখতে গেছে, তখন চয়নের কাছে স্বপ্নপুরীর কল্প লোকের মতো লেগেছিলো।  
বাঁশ নাচানি, বারালি তলা, লালু, পপের মা, বগার বউ। সবকিছুই চয়নেকে ঘিরে রাখে। গ্রামে কাটানো প্রতিটা মুহূর্তই চয়নের কাছে বিস্ময় ছিলো। চয়নকে যেন বাড়ালি তলার হিজল গাছ, বাঁশ নাচানির দল, রানু, মিনি, লালু আর নাম নাম না জানা ফেলে আসা দিনের সেই ছেলেবেলার সাথিরা ও দিনগুলি প্রতিনিয়ত ডাকছে। চয়ন কেমন এক মাতাল করা স্মৃতির মনি-মালা গলায় জড়িয়ে আজো হাড়িয়ে যায় গ্রামে। গায়ের পথে পথে।
*****
বিন্তি ফকির বাড়ির মেলার পরের দিন চয়নের দাদি এসে এক অপূর্ব সত্যি গল্প শুনালো। গল্পটা ভৌতিক হলে ও চয়নের দাদির নিজের দেখা সবকিছু। এমনিতেই চয়নদের বাড়িটা অরন্যের অংশের মতো। ছোট খাটো অরন্যই। গভির রাতে চয়নের দাদা, দাদিকে ঘুম থেকে জাগালো। সেসময় চয়নদের টয়লেট ঘরের বাইরে ছিলো। তখন গ্রামের ব্যাপারটা এমনই ছিলো। যদিও চয়ন এই কারণে গ্রামে আসতে চায়না। কেরোসিন তেলের প্রদিপ হাতে করে দাদি বসে ছিলো। দাদা তখন আরামসে টয়লেট করছে। চয়নদের সেই সময়ের গ্রামের বাড়িটা টিনও কাঠের তৈরী ছোট খাটো বাংলোর মতো ছিলো। মূল দরজার সামনের দিকে কাঠের তৈরী কারনিশ আছে। কারনিশে বসে গ্রামের মেয়েরা আরাম করে, গল্প করতো। কতো রকমের গল্প! আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, পাওয়া- না পাওয়ার গল্প। কারনিশে একজন মহিলা শুয়ে আছে। দাদি কাছে গেলো। মহিলা পরেছে সাদা রঙের  চওরা লাল পারের গরদের শাড়ি। কপালে পরেছে শিদুরের ফোটা ও গাড় করে শিদুর। অপূর্ব সুন্দর দেখতে। ঠিক যেন একটা পরি। পথ ভুল করে এই বাড়িতে চলে এসেছে। পরি গভির ঘুমে আচ্ছন্ন। দাদা টয়লেট থেকে এসে মহিলাটিকে জাগিয়ে তুললো। মহিলা আর-মোর দিয়ে জেগে উঠলো। চয়নের দাদা জানতে চাইলো, 
-তুমি কে? এখানে কেন এসেছো?
-বিন্তির বাড়ির মেলায় এসেছিলাম। খুব ঘুম পাচ্ছিলো। তাই এখানে ঘুমিয়ে পরেছিলাম। 
মহিলা তারপর উঠে বসলো। তারপর বকুলতলা দিয়ে হেটে চলে গেল। চয়নের দাদা ও দাদি দুজনেই কিছুটা এগিয়ে গেলো। মূহুর্তের মধ্যেই মহিলাকে আর দেখা গেলোনা। এরপরই চয়নের দাদা-দাদি বুঝতে পারলো যে, এই মহিলা মানুষ ছিলোনা। পরি ছিলো। চয়নের কেবলি মনে হলো, সত্যিকারের পরি! আহা আমি যদি একবার দেখতে পেতাম! এরপর চয়ন যতবার গ্রামে গেছে ততবারই শিদুর পরা সেই পরির কথা দাদির কাছ জানতে চেয়েছে। কিন্তু সেই পরি আর কোনদিন ফিরে আসেনি। চয়ন চোখ বন্ধ করলেই দাদির কাছ থেকে শোনা পরিকে দেখতে পায়। পরির বলা সেই কথাগুলো শুনতে পায়।
-আমি বিন্তি ফকির বাড়ির মেলায় এসেছিলাম। খুব ঘুম পাচ্ছিলো। তাই ঘুমিয়ে পরেছিলাম। চলবে…

হুমায়ুন কবির
ঢাকা, বাংলাদেশ।