অটোয়া, শনিবার ১৭ আগস্ট, ২০১৯
বাদাইম্যা (৫) – কবির চৌধুরী

বাদাইম্যা (৪) পড়তে ক্লিক করুন

নকনে ঠান্ডা। চব্বিশ ঘন্টার মত হয় স্নো পড়ে নি। বড় বড় ট্রাকগুলোকে গতরাতে রাস্তায় জমাকৃত স্নো পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। রাস্তা পরিষ্কারের হুলস্থুল দেখে মনে হয়েছে নিশ্চয়ই আর স্নো পড়বে। ভাগ্য ভাল সারাদিন কোন স্নো পড়েনি। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে রাতের দিকে স্নো পড়তে পারে। হানিফের মনটি ভাল নেই। আনমনে হাঁটছে। উদ্দেশ্য ব্রনসন সেন্টার। সেন্টলোরেন্ট বাস টার্মিনাল থেকে বাস নিয়েছিল। ডাউনটাউন পর্যন্ত বাসেই এসেছে। কিন্তু মনের অস্থিরতার কারণে সে ব্যাংক স্ট্রিটেই নেমে পড়ে। আজ খুব বেশি ‘মিন্টুভাই’-য়ের কথা মনে পড়ছে। আজকের যে অনুষ্ঠানে সে যাচ্ছে, সেই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে এ্যাসোসিয়েশন। প্রায় হারিয়ে যাওয়া সংগঠনের আজকের এই অবস্থান ‘মিন্টুভাই’-য়ের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। অটোয়ার অনেকের মত হানিফও একসময় ‘মিন্টুভাই’কে সর্বোতভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। প্রবাসের ব্যস্তজীবনের প্রায় প্রতিদিনই সে মিন্টুভাইয়ের সাথে টেলিফোনে আলাপ করত। কথা বলত। সেরকমই আলাপে একদিন বললেন,    
-হানিফ ভাই, সবাইকে বুঝাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। অনেকদিন থেকে সমিতির কোন কর্মকান্ড নাই। এরই মাঝে শহরে অনেক সংগঠনের জন্ম হয়েছে। প্রত্যকে তার নিজ নিজ মনমানসিকতা আর চিন্তাচেতনার মানুষকে নিয়েই থাকতে চায়। বলে, ‘আপনি করেন, আমরা সাহায্য করবো_ কিন্তু কমিটিতে থাকতে পারবো না’। 
-জ্বী মিন্টুভাই। আপনি তো আশা-যাওয়ার মধ্যে, প্রায় সময়ই কানাডার বাইরে থাকেন। বাংলাদেশে দেশে থাকেন। গত কয়েকবছর আমিও চেষ্টা করেছি। কিন্তু আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। আমার মনে হয় এর মূল কারণ শহরের বর্ধিষ্ণু কমিউনিটি। আপনি শুনলে খুশি হবেন, এখন আমাদের এই শহরে প্রায় ১০হাজারের মত বাংলাদেশিদের বসবাস এবং সবাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কোন অনুষ্ঠানে না গেলে, না দেখলে বুঝারই উপায় নাই যে, অটোয়াতে এত সাংস্কৃতিক কর্মী আর শিল্পির বসবাস।  
-তাই নাকি?    
-জ্বী ‘মিন্টুভাই’।           
-তাহলে তো ওদের সাথে আলাপ করতে হয়। আমাকে একটু নাম্বারগুলো দিয়েন তো। 
-জ্বী, দেব। ‘মিন্টুভাই’, সমিতির পুরনো নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করেছেন? 
-হ্যাঁ, ড. শহীদভাইসহ অনেকের সাথে আলাপ করেছি। সবাই খুশি। তবে সবারই এককথা- সমিতিকে পুনর্গঠন করতে কষ্ট হবে।        
-কষ্ট হবে ঠিক, তবে অসাধ্য নয়। সংগঠনের পুরাতন নেতৃবৃন্দসহ আমরা সবাই যদি চেষ্টা করি তাহলে সম্ভব। খুবই সম্ভব। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। অধিকাংশই কোন না কোন সংগঠনের সাথে জড়িত। আপনি শুনলে আশ্চর্য হবেন, একসময় যারা সমিতিকে রেজিষ্টার্ড করতে বাঁধা দিয়েছেন, যারা রেজিষ্ট্রেশনের ঘোর বিরোধী ছিলেন, তারাই এখন কিছু সংগঠনের ডিরেক্টর-পরিচালক। আবার অনেক আনুষ্ঠানিকভাবে কোন সংগঠনের সাথে জড়িত না হলেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজ নিজ পরিমন্ডলে একত্রিভূত। আপনি যদি ফেইসবুকের দিকে নজর রাখেন তাহলে দেখবেন প্রতিদিনই কোন না কোন বাসায় কোন না কোন জায়গায় কিছু না কিছু হচ্ছে।      
-এটা তো খুবই ভাল। স্বচ্ছতার জন্য রেজিষ্ট্রেশন খুবই প্রয়োজন। আমাদেরও উচিত ছিল সমিতিকে রেজিষ্টার্ড করা। আমি তা চিন্তা করছি না, আমি চিন্তা করছি ছোট এই কমিউনিটিতে আলাদা আলাদা সংগঠনের এত প্রয়োজন কেন? সবাই তো একই কাজ করতে চায়। বাংলাদেশ সমিতির মাধ্যমেই তো তা করতে পারে।    
-ঠিক জানি না, হয়তো সবাই নিজস্ব গন্ডির মধ্যে থাকতে চায়। যেখানে দুজারজন মিলেই কিছু করা যায়_ সেখানে পুরো কমিউনিটির মানুষকে জড়িত করে কিছু করার দরকার কি। এ্যাসোসিয়েশন করলেই তো দায়বদ্ধতা বেড়ে যাবে। জবাবদিহি করতে হবে। 
-হতে পারে।    

এরকম হাজার চিন্তার মাঝে হানিফ ব্যাংক এবং নেপিয়ান স্ট্রিটের কর্ণারে নেমে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটি সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে থাকে। রাত প্রায় সাড়ে নয়টা। সাইডওয়াকগুলো পরিস্কার থাকায় হাঁটতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু বিচ্ছিন্ন চিন্তাগুলো তার মাথা থেকে যাচ্ছে না। আজ অটোয়ায় অস্থায়ী শহীদ মিনারে শহীদদের উদ্দেশ্যে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে। ইচ্ছা করলে স্থায়ীভাবেই শহীদ মিনার করা যায়। সবাই যদি ২/৪টাকা করে দেয় তাহলে বছরখানেকের মাথায়ই একটি শহীদ মিনার করা যায়। আমরা কি মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা-পয়সা খরচ করে মন্দির-মসজিদ বানাচ্ছি না? বানাচ্ছি। কিন্তু শহীদ মিনার বানাবো না। শহীদ মিনার বানাতে যে দেশ-প্রেমের প্রয়োজন তা আমাদের মধ্যে নাই। আরে শুধু কি দেশ-প্রেম! আমরা আমাদের নিজেদেরকেই ভালবাসি না। যদি বাসতাম তাহলে কি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় এই হৃদয়বিদারক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটা ঘটতো। একটি গাড়ির সিলিন্ডার থেকে আগুনের উৎপত্তি। মুহূর্তের মধ্যে শ’খানেক মানুষের অকাল মৃত্যু। অথচ এই সিলিন্ডার ছাড়াই গাড়ি চালানো যেত। নিশ্চয়ই গাড়িটার মালিক কোটিপতি। সরকার কেন গাড়িতে সিলিন্ডার ব্যবহার নিষিদ্ধ করে না_ যেখানে সেখানে গজিয়ে উঠা দালান-পাট ভেঙ্গে রাস্তা কেন বড় করে না, তা হানিফ বুঝতে পারে না। হানিফ বুঝতে পারে না বাংলাদেশের মানুষ কোটি কোটি টাকা খরচ করে দোকান-পাট কিনে, ঘরবাড়ি বানায় অথচ রাস্তা কেন বানাতে চায় না! কোটি টাকার বাড়িতে যাওয়ার জন্য রাস্তা থাকে না। গলিতে একসাথে দুটো গাড়ি চলাফেরা করতে পারে না। অথচ শুনেছি, আগের জামানায় নাকি বাড়িঘরে যাওয়ার জন্য বড় বড় রাস্তা থাকতো, যেখান দিয়ে অনায়াসে হাতি-ঘোড়া চলাফেরা করতে পারত।   

আজ আজগুবি সব চিন্তা হানিফকে একেবারে পাগল করে ফেলেছে। এই যে, সে অটোয়ায় বাস করে সেটি কি বাংলাদেশের চেয়ে আলাদা? অটোয়া কি শুরুতে এরকম ছিল? না মোটেই তা নয়! প্রায় দুইশত বছর আগে অটোয়াতে যখন ব্রিটিশ নাগরিক ফিলোমন রাইট কৃষিকাজ করার জন্য ৪/৫পরিবার এবং কিছু শ্রমিক নিয়ে অটোয়ায় বসতি স্থাপন করেন তখন অটোয়া একেবারে জনমানবশূন্য ছিল। আমেরিকার আগ্রাসন থেকে বাঁচার জন্যই রানী ভিক্টোরিয়া ১৮৫৫ সালে আইসোলেটেড এই শহরটিকে, কনাডা প্রভিন্সের রাজধানী হিসাবে পছন্দ করেন। তাঁর পছন্দের কারণ, অটোয়া অনেকটা আইসোলেটেড এবং টরেন্টো, কিংসটন, মন্টিয়েল এবং কুইবেক সিটির মধ্যখানে অবস্থিত। পরবর্তীতে ১৮৬৬ সালে কনফেডারেশন গঠিত হওয়ার পর কানাডার রাজধানী হিসাবে যাত্রা শুরু করে। প্রায় দশ হাজার বছর আগে শাম্পলেইন সীর ড্রেইনিং থেকে সৃষ্ট এই ভূখন্ডটি অটোয়া রিভারের পাশে অবস্থিত হওয়ায় লেক অন্টারিও হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের আক্রমণ থেকে অটোয়াসহ মন্ট্রিয়ল এবং কিংসটন শহরকে রক্ষা করার জন্য ১৮২৬ সালে রিডো ক্যানেল প্রজেক্টের উদ্যোগ নেওয়া হয়।। ক্যানেলটি বানানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ার কর্ণেল জন বাই-কে। তাঁর নামানুসারে ১৮২৬ সালেই এলাকাটি বাইটাউন হিসেবে পরিচিতি পায়, যা পরবর্তীতে ‘অটোয়া সিটি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। একসময় যে ক্যানেলটি বানানো হয়েছিল বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে মন্টিয়ল আর কিংসটনকে রক্ষা করার জন্য, কালের পরিক্রমায় সেই ক্যানলেটি এখন লাখ লাখ স্কেটিংপ্রিয় দর্শনার্থীদের প্রিয় আউটসাইট স্কেটিংরিং! এসব উন্নত দেশগুলোর মানুষ তো আমাদের মতই। তারা যদি শ’-শ বছর আগে শ’-শ বছর পরের চিন্তা করে কিছু বানাতে পারে, প্লেন করতে পারে_ তাহলে আমরা কেন পারি না?        

আবোলতাবোল চিন্তা করতে করতেই হানিফ প্রায় রাত ১০টা সোয়া দশটার দিকে ব্রুনসন সেন্টারে প্রবেশ করে। ব্রনসন সেন্টারে প্রবেশ করে তো হানিফের চক্ষু ছানাবড়া। একি দেখছে! হলের ভিতরে বিরাট বড় শহীদ মিনার তার আপন মহিমা নিয়ে স্বগর্ভে দাঁড়িয়ে আছে। ছাদ পর্যন্ত উচু, মনে হচ্ছে ছবিতে দেখা বাংলাদেশের জাতীয় শহীদ মিনার হানিফের সামনে কেউ এনে বসিয়ে রেখেছে। একনিমিষেই হানিফের মাথা থেকে গত কয়েকদিনের সবচিন্তা চলে যায়। হাসতে হাসতে সে দর্শকের সারিতে বসা হোসেন মুনীরের দিকে এগিয়ে যায়… চলবে।

কবির চৌধুরী
অটোয়া, কানাডা।