অটোয়া, বুধবার ২৮ জুলাই, ২০২১
ভরা জোছনার রাতে কোন এক দ্বীপে – চিরঞ্জীব সরকার

হুদিনের স্বপ্ন ছিল কোন এক জোছনায় সাগরের বেলাভূমিতে ঘুমিয়ে থাকব একটি রাত, একাকী ঢেউয়ের গর্জন শুনতে শুনতে। বৃহৎ যে কোন কিছুর সামনে দাঁড়ালে আসলে আমরা আমাদের জীবনের ক্ষুদ্রত্ব উপলদ্ধি করতে পারি। সমূদ্রের শো শো শব্দের ভিতর আমাদের আদি ডাক বা আহ্বানের কথা ধ্বনিত হয়। সারা দিনের সমস্ত লেনদেন ঘুচিয়ে পাখিরা যেমন সন্ধ্যায় নীড়ে ফিরে আসে, জীবনের সমস্ত কোলাহলকে সুদূরে মিশিয়ে দিয়ে সাগর যেন তার অকৃত্রিম শব্দে মানুষকে আমন্ত্রন করে তার বুকে ফিরে যেতে। অনেক সমূদ্রের লোনা জল স্পর্শ করেছি,গায়ে মেখেছি চিকচিকে ভেজা বালি  প্রশান্ত  থেকে অতলান্তিক মহাসাগরে। ভূমধ্যসাগর, ভারত মহাসাগর, কাস্পিয়ান সাগর থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরের তীরে অনেক হেটেও কখনো আবকাশ মেলেনি একান্তে বেলাভূমিতে নিঃশব্দে একটি রাত্রি যাপনের যেখানে থাকব শুধু আমি একা, আর উপরে  শূন্যের আকাশ যার কোলে লেগে থাকা রাতের সোনালী চাঁদ অকাতরে ঢেলে দিবে নিচের পৃথিবীকে তার জোছনার ঢেউ। অন্যদিকে  সৈকতের ঢেউগুলি থেকে  বারিবিন্দু ছিটকে  এসে লাগবে  এ উদাসী দেহের চোঁখে, মুখে, হাতে এক অনাবিল আদরের শীতল স্পর্শে।

দিন যায় বছর যায় অমোঘ কালচক্রের শাশ্বত নিয়মে। মনের গভীরে লুকানো এ বাসনাটি যেন কিছুতেই পূরন হচ্ছিল না। কক্সবাজার, পতেঙ্গ, কুয়াকাটা, মোম্বাসা, ডোসান, দার-এস-সালাম এসব জায়গার বেলাভূমিতে গিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে  সমূদ্রস্নানে সময় অতিবাহিত করলেও মনের অজান্তে থাকা সৈকতে একাকী রাত্রিযাপনের স্বপ্নবিলাস কল্পনার আকাশেই ভাসছিল নানাবিধ কারনে। অবশেষে বিধাতা মনে হয় সুপ্রসন্ন হল। ২০০৬ সালে ভিয়েতনামের ক্যাটবা আইল্যান্ডে আমার সে নির্ভেজাল বাসনাটি বিধাতা পূরন করে দিল আমারি অগোচরে। সেদিন মনে হল কোন বাসনা যদি নির্মল ও খাটি হয় সৃষ্টিকর্তা হয়ত তা মানুষকে  পূরন করে দেয় জীবনের কোন না কোন একটা পর্যায়ে।

হ্যানয় থেকে গাড়িতে চেপে ক্যাট বার উদ্দেশ্যে রওহনা হলাম খুব ভোরে। পথের মাঝে মাঝে ধান ক্ষেত মনে করে দিচ্ছিল বাংলাদেশকে। ধানক্ষেত আর বাংলাদেশতো সমার্থক। সবুজ ধানের উপর যখন বাতাসের প্রবাহ ধানক্ষেতকে আন্দোলিত করে তখন ঢেউ খেলানো মাথা নোয়ানো ধানের অপরূপ বিন্যাসে অপলক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে থাকতাম আনমনে। অবারিত সবুজের এ ক্ষেতগুলিকে তখন মনে হত যেন সৌন্দর্যের লহরীতে সামিল হওয়া এক অপ্রাকৃত আনন্দে নৃত্যরত জলসার আঙ্গিনা। গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে দেখছি ভিয়েতনামের কৃষকদের ক্ষেতগুলি আর পরিচর্যারত ভিয়েতনামী মহিলাদের যাদের প্রাধান্য এখানে হাটে, মাঠে, ঘাটে, কারখানায় সর্বত্র। মাথায় ট্রাডিশনাল কৌনিক হ্যাট পরা ভিয়েতনামী মহিলাদের কর্মরত থাকার দৃশ্যপট এখানে খুবই সাধারন। দেশটি  কৃষি প্রযুক্তিতে বেশ দক্ষতা অর্জন করেছে। ফল ফলাদি উৎপাদনেও তাদের সাফল্য  অনেক। ফল কাটতেও তারা বেশ মুন্সীয়ানার পরিচয় দেয়। এটা অবশ্য শুধু ভিয়েতনামীরা নয়, এ অঞ্চলের যে কোন দেশে এরা ফুল বা ফলকে এমন সুন্দর করে সাজাতে বা কাটতে পারে মনে হবে যেন  এ ব্যাপারে তারা  এক একজন মাস্টার আর্টিস্ট।

গাড়ি যাত্রা শেষে ফেরিতে জলযাত্রা। দক্ষিন চীন সাগরের ভিতর আমাদের ফেরি চলা শুরু করল ক্যাট বার উদ্দেশ্যে। মাঝে মাঝে কিছু সমূদ্রগামী জাহাজ দেখছি। ওগুলো হয়ত হাই ফং পোর্টে নোঙ্গর করবে বা ওখান থেকে ছেড়ে এসেছে। ফেরিতে আবার দেখলাম আমাদের দেশের মত সিদ্ধ করা গরম হাসের ডিম বিক্রি করছে একটা মেয়ে ঝুড়িতে করে। ডিম বিক্রেতা মেয়েটি ভালই ইংরেজী পারে। আমি জিজ্ঞেস করলাম দিনের শেষে তার কত থাকে সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে। ও ভিয়েতনামী মূদ্রা ডং-এর যে হিসাবটি বলল তা আমি বাংলাদেশী মূদ্রায় কনভার্ট করে দেখলাম শদেড়েক টাকার মত হয়। ভাবতে লাগলাম খুব বেশি চাওয়া পাওয়া না থাকলে গ্রামে যেখানে সাধারনত বাড়ি ভাড়া দিতে হয় না এবং যদি অসুখের পিছনে টাকা খরচ করতে না  হয় তাহলে এ ইনকাম দিয়েও মোটামুটি বাজার সদাই করে পৃথিবীর কতশত শ্রমজীবি মানুষ দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। হয়ত এ মেয়েটিও তার মা বাবাকে নিয়ে সারা  দিনের পরিশ্রম শেষে তৃপ্তিতে টেনশনহীন ভাবে রাতে ঘুমিয়ে পরে এবং নতুন একটি সকালে  জাগরিত হয়ে আবার বেড়িয়ে পরে রুটি রুজির  হররোজ সংগ্রামে। আরো ভাবছিলাম পরিশ্রান্ত মানুষগুলোর ঘুমের জন্য স্লিপিং পিলের প্রয়োজন হয় না। ইন্দ্রনাথ যখন কলকাতার  বাবু নতুনদার জন্য খাবার আনার জন্য রাতে  ঝাপ ফেলানো এক দোকানের দোকানীকে উচ্চস্বরে ডেকে তাকে সজাগ করার চেষ্টা করেছিল তখন অমর কথাসাহিত্যিক শরৎ চন্দ্র বলেছিলেন  শ্রমজীবি মানুষ ঘুমাতে জানে, এদের ঘুম এত সহজে ভাঙ্গানো যায় না।

ফেরি থেকে নেমে ক্যাট বার সৈকত সংলগ্ন হোটেলের দিকে যাচ্ছি। ম্যনগ্রোভ বন চোখে পড়ল। অনেকটা বাংলাদেশের সুন্দরবনের মত। আধা ঘন্টা পর হোটেলে পৌঁছলাম। হোটেলে একটু বিশ্রাম নিয়ে দ্বীপটিকে দেখতে বেড়িয়ে পরলাম। বিচিত্র ধরনের গাছপালা ও লতাগুল্ম। কোন কোনটা চিনি তবে বেশিরভাগই অচেনা। একটা গাছের পাতা এত সুন্দর যে একটু স্পর্শ করতে ইচ্ছে হল। পাতাটা একটু ধরতে যাব এমন সময় পিছন থেকে একজন ভিয়েতনামী  দৌড়ে এসে আমাকে থামাল। সে যেটা বলল তা হল ওটা নাকি এমন এক ধরনের পাতা যা ধরলে শরীরে চুলকানি শুরু হবে। বাংলাদেশে আমাদের অঞ্চলে এক ধরনের পাতা আছে যাকে আমরা আঞ্চলিক ভাষায় বলতাম চোচরা পাতা যা শরীরে বা হাতে লাগলে চুলকানি শুরু হত। ভাবলাম এটা হয়ত চোচরা পাতার ক্যাট বা সংস্করন। পাতা নিয়ে আমার একটা ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আছে। ছোটকালে একবার ভুলক্রমে কচুপাতা মুখে দিয়েছিলাম। এরপর কচুপাতার অক্সালিক এসিডের প্রদাহে আমার গলায় মনে হয়েছিল কেউ  যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ছট্ফট্ করতে করতে মুখে অনেক লবন দিয়ে লালা নিঃসরন করে সে বিষযন্ত্রনা থেকে সেবার মুক্তি পাই। এরপর থেকে যে কোন পাতার ব্যাপারে মোটামুটি সাবধানতা অবলম্বন করি।

রাতে হোটেলের ব্যালকনি থেকে লক্ষ্য করি পূর্নিমার চাঁদ উঠেছে। আকাশের জোছনার সাগর যেন নীচের পৃথিবীর সাগরে নেমে এসেছে। মনে মনে কবির ভাষায় বলি ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে/ বসন্তের এ মাতাল সমীরনে’। অদূরের সৈকতে দেখি লোকজন ভীড় করেছে। আমি ঠিক করলাম লোকজন যখন চলে যাবে তখন একাকী গিয়ে কয়েক ঘন্টা কাটিয়ে দেব বেলাভূমির এ জল জোছনার অপার্থিব জগতে। রাত বারটার দিকে যখন দেখলাম তটরেখা জনমানবশূন্য আমি তখন একাকী ওখানে উপস্থিত হলাম। একটা হেলানো চেয়ারে শুয়ে কুলে আঘাত হানা ঢেউগুলোকে দেখছিলাম। কোন কোন ঢেউয়ের ফেনা আমার পায়ে এসে লাগছিল। আর চাঁদের আলোতে জীবনানন্দের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় পৃথিবী মায়াবীরূপ পরিগ্রহ করেছিল। বাতাসো বইছিল নান্দনিক একটা ছন্দে। সমূদ্রের শো শো শব্দ যেন বলছিল, ’সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোন শোন পিতা/ কহো কানে কানে, শুনাও প্রানে প্রানে মঙ্গল বারতা।‘ কখন ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতে পারলাম না। সমূদ্র থেকে উঠে আসা ভোরের সূ্র্যের প্রথম আলোকরশ্মি যখন আখিতে এসে পড়ল তখন বুঝতে পারলাম নিশি কেটে গেছে মোর এ বেলাভূমিতে। বিধাতাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে আমিও মিশে যাই আবার নিত্যদিনের জনঅরন্যে জীবন জীবিকার সে অতি পরিচিত সংগ্রামে।

চিরঞ্জীব সরকার। কানাডা